বাসা-হোটেলে চলছে ‘ইয়াবা আসর’

576

রাজধানীতে ভাড়া বাসা ও আবাসিক হোটেলের কক্ষে ‘ইয়াবার আসর’ বসাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এসব আসরে ইয়াবা সেবন, এমনকি অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও দেওয়া হয়।

সেখানে একা বা দল বেঁধে অংশ নেয় ইয়াবাসেবীরা। সম্প্রতি রাজধানীতে কয়েকটি অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এবং পুলিশ-র‌্যাবের গোয়েন্দারা এমন তথ্য পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত দুই মাসে ১০টি বাসা ও হোটেলে অভিযানে ক্রেতাদের ইয়াবা সেবনের জন্য ‘বিশেষ সেবা’ দিতে দেখা গেছে। ছদ্মপেশার আড়ালে বাসায় মজুদ করে ইয়াবা বিক্রির মাধ্যমে কোটি টাকার মালিক বনে গেছে অনেকে। পরিবারের সদস্যরা মিলে করছে ইয়াবার কারবার। কিছু হোটেল কর্তৃপক্ষও জড়িয়ে পড়েছে এই অপকর্মে। তারা ক্রেতা-বিক্রেতাদের হোটেলের কক্ষে রেখে সহায়তা করছে। কোথাও হোটেলের কর্মচারীরা অভ্যাগতদের কাছে ইয়াবা বিক্রি করছে।

সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে মিয়ানমার সীমান্তে এবং প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এ কারণে কৌশল পাল্টেছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। তারা এখন নারী বাহক ও কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেলে ছোট চালান ঢাকায় আনছে। এরপর ‘নিজস্ব আসরে’ সরাসরি বিক্রি করছে। রাজধানীর রাজারবাগ, ফকিরাপুল, মতিঝিল ও পল্টনের বেশির ভাগ হোটেলে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। আলামত জব্দ করার মতো সুযোগ না পাওয়ায় অভিযান চালাতে পারছে না ডিএনসির দল।

গত শুক্রবার রাতেও রাজধানীর মতিঝিল থেকে কামাল হোসেন (২৭) ও আমিনুল ইসলাম (২৬) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএনসি। সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসে আসা পাঁচ হাজার ইয়াবার চালানসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার কুরিয়ারে আসা ৩০ হাজার ইয়াবাসহ আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএনসি কর্মকর্তারা বলছেন, কুরিয়ারে ইয়াবা এনে ঢাকায় বিক্রি করছে এমন একটি বড় চক্রের হোতা ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন। এই ইয়াবা ডিলারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি পান্থপথে ‘হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেন’ নামের হোটেল থেকে সাত হাজার ৮৯০টি ইয়াবা বড়িসহ একই পরিবারের চারজন ও দুই ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। পার্সেলে ইয়াবা এনে কক্ষে রেখে বিক্রি করতে সহায়তা করছিল হোটেলটির দুই ব্যবস্থাপক।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন বাসা ও হোটেলে রেখে ইয়াবা বিক্রি করছে কারবারিরা। এমন তথ্য পেয়ে আমরা অভিযান জোরদার করেছি। কয়েকটি চক্র ধরা পড়েছে। তবে আলামত না পেলে যতই তথ্য থাকুক অভিযান চালানো যায় না। ’

গত ২৩ জুলাই রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে ইয়াবা কারবারি রিপনকে ৪০০ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যে শেওড়াপাড়ার ৫৮৩ নম্বর বাড়ির ৭বি ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে মূল ব্যবসায়ী উজ্জলের স্ত্রীর রত্নাকে ১৯ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। রিপন ও রত্নাকে তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় ডিবি। সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মিয়া কুতুবুর রহমান বলেন, কৌশলে পালিয়ে যাওয়া উজ্জল কোটিপতি ইয়াবা ব্যবসায়ী। তার শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পৌঁছে দেয় রিপন। সব ধরনের হিসাব রাখে স্ত্রী রত্না। ব্যবসার সুবিধার্থে মোহাম্মদপুর, উত্তরাসহ একাধিক স্থানে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে উজ্জল। ওই সব ফ্ল্যাটে ইয়াবা সেবনও করা হয়। ওই ফ্ল্যাটগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং সাজানো। পাঁচ বছর আগে র‌্যাবের হাতে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল উজ্জল। কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে তিন লাখের বেশি ইয়াবা বিক্রি করেছে সে।

গত ৯ জুলাই ধানমণ্ডির তিনটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাদের মধ্যে চার নারী একই পরিবারের সদস্য। তারা স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবসার আড়ালে ফ্যাট ভাড়া নিয়ে ইয়াবার কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। ডিএনসির সহকারী পরিচালক (এডি) খুরশিদ আলম বলেন, এলিফ্যান্ট রোডে বাটা সিগন্যালের কাছে ১৭৩ নম্বর বাড়ি থেকে ৩২ হাজার ইয়াবাসহ আসমা আহমেদ ডালিয়া ও তার স্বামী রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কলাবাগানের ৪৮ নম্বর ফ্ল্যাট বাসা থেকে আসমার বোন স্বপ্না, তার স্বামী শামিম ও ফুফু মাহমুদাকে ছয় হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ৫২/৩ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আসমা ও স্বপ্নার মা মনোয়ারাকে ১২ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। দুই দিনের রিমান্ডে আসামিরা ইয়াবা ব্যবসায় কোটি টাকার মালিক হওয়ার কথা স্বীকার করে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর বনশ্রীর জি-ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের ৮০/৩০ নম্বর বাসা থেকে ১০ হাজার ১০০ পিস ইয়াবাসহ ডিএনসি তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলো পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এসআই সালাউদ্দিনের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার এবং সালাউদ্দিনের বন্ধু পলাশ চন্দ্র দাস ও পলাশের স্ত্রী কুলসুম আক্তার। ডিএনসির এডি খুরশিদ আলম বলেন, আসামিদের তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা ইয়াবা ব্যবসার কথা স্বীকার করে। তবে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়নি। তারা মূলত বাসা থেকেই ইয়াবা বিক্রি করত।

পান্থপথে হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেন থেকে আব্দুল আজিজ, তার স্ত্রী রিনা আক্তার, তাদের ছেলে সুমন ও রতন, হোটেলের ব্যবস্থাপক এনামুল হক নয়ন ও সারোয়ার কামালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাব-২-এর কম্পানি কমান্ডার (স্পেশাল কম্পানি) মেজর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে তারা দুটি প্যাকেটের একটিতে কাপড় ও অন্যটিতে ইয়াবা রেখে দুটিতেই কাপড় আছে বলে ঢাকায় কুরিয়ার করে। তারপর তারা সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা রওনা হয়। ঢাকায় এসে হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অবস্থান নেয়। সেখানে থেকে চালানের ডেলিভারি গ্রহণ করে। আর এই চালান পাঠানো হয় হোটেল ম্যানেজারের নামে। তার সহযোগিতায় হোটেলে অবস্থান করে ইয়াবা চালান নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে আবার চট্টগ্রাম ফিরে যায় তারা। একইভাবে চালান গ্রহণের সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এই ইয়াবা কারবারে হোটেলের লোকজন জড়িত। ’

র‌্যাব ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ওলিও হোটেলের কক্ষে নিয়মিত ইয়াবার আসর বসে। সেখানে চুক্তির মাধ্যমে ইয়াবা সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালছিল। এ তথ্য থাকার পরও প্রমাণের অভাবে অভিযান চালাতে পারছিল না ডিএনসি, র‌্যাব ও পুলিশ। কারণ হোটেলটির মালিক লায়ন ফিরোজুর রহমান ওলিও প্রভাবশালী ব্যক্তি। গত ১৫ আগস্ট তাঁর মালিকানাধীন আরেকটি ভবনের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে পুলিশের অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক জঙ্গি নিহত হয়।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ওই হোটেল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি। হোটেলের অভ্যর্থনায় গেলে মালিক ও তাঁর ছেলে বিদেশে আছেন বলে জানানো হয়। সিনিয়র ম্যানেজার সোহেল হায়দার মোবাইল ফোনে বলেন, ‘নয়ন বা কেউ যদি ইয়াবার সঙ্গে জড়িত থাকে সেটা তার ব্যাপার। আমাদের এখানে এসব হয় না। ’

ডিএনসির সূত্র জানায়, গত ২৭ আগস্ট ওলিও-এর মতোই রাজারবাগ আউটার সার্কুলার রোডে ৮৭৩ নম্বর ভবনে ‘হোটেল গোল্ডেন ইন্টারন্যাশনালে’ অভিযান চালানো হয়। তখন ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে আলিম ও আমিনুল ইসলাম নামের হোটেলের দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। হোটেলটির মালিক মোহাম্মদ মোস্তফা দীর্ঘদির ধরে অভ্যাগতদের কাছে ইয়াবা বিক্রি করছিল বলে তথ্য পায় অভিযানকারী দল।

ডিএনসির এডি খুরশিদ আলম বলেন, ‘আর কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মতিঝিলে অনেক হোটেলে মাদকের আসর চলছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তারা এক পিস-দুই পিস ইয়াবা দেয়। অভিযান চালাতে গেলে আলামত মেলে না। তবে আমাদের নজরদারি আছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY