উত্তেজনা প্রশমনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি

603
লংগদুতে পাহাড়ি গ্রামে পুড়িয়ে দেওয়া বাড়ি। ছবিটি ৩ জুন তোলা।

রাঙামাটির লংগদুতে সহিংস ঘটনায় দায়ের দুটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব স্থানীয় পুলিশের পরিবর্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অথবা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা তদন্ত কমিটি বলেছে, হত্যাকাণ্ড এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার।

পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকে অবহিত থাকলেও তা প্রশমনে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে মতামত দেওয়া হয়েছে।

গত জুনে রাঙামাটির লংগদুতে ঘটা সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি পরিবীক্ষণ অধিশাখা একজন অতিরিক্ত সচিবকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের এ তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পক্ষে ওই প্রতিবেদনটি দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আদালত শুনানির জন্য আগামী ৬ ডিসেম্বর পরবর্তী দিন রেখেছেন।

এই আদালতে নিয়োজিত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, লংগদুতে পাহাড়িদের গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও উচ্ছেদের ঘটনা তদন্তে আইন অনুসারে কমিশন কেন গঠন করা হবে না এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতি কেন নিরূপণ করা হবে না তা জানতে চেয়ে গত ২১ আগস্ট হাইকোর্ট রুল দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

গত ১ জুন লংগদু সদর ইউনিয়নের যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নের মৃতদেহ উদ্ধার হলে ওই এলাকায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরদিন ২ জুন লংগদু উপজেলার চারটি গ্রামে পাহাড়িদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে ওখানকার বাসিন্দা, ক্ষতিগ্রস্ত দুই ব্যক্তি ও আইনজীবীসহ নয়জন গত আগস্টে রিট করেন। এর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২১ আগস্ট রুলসহ আদেশ দেন হাইকোর্ট।

সুপারিশের অংশবিশেষ

তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এলাকা হওয়ায় সেখানে পদায়ন করা সরকারি কর্মকর্তাদের যোগদানের আগে বিশেষ ওরিয়েন্টেশনের (পরিচিতিকরণ) ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বাড়িঘর নির্মাণসহ পুনর্বাসন অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে সুপারিশে বলা হয়, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট স্থাপনের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনের সুপারিশে। তা ছাড়া ওই সহিংস ঘটনার সময় যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার আশঙ্কা থাকলে তা কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ভূমিকা পালন করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য সম্প্রীতি সমাবেশ আয়োজন এবং সব বিভাগের সরকারি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পদায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

লংগদুতে সহিংসতার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। পাহাড়িরা পুনর্বাসিত বাঙালিদের দীর্ঘদিনেও আপন করে নিতে পারেনি। অপরদিকে বাঙালিরা মনে করে, তারা অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে এখানে সার্বক্ষণিক অবিশ্বাস বিরাজ করছে। এই আস্থার সংকট থেকে বিভিন্ন সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটে এবং তা পরবর্তী সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় রূপ নেয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে যেকোনো বিষয় নিয়ে মতানৈক্য হলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে। এলাকায় পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে উত্তেজনার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকে অবহিত থাকলেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের অভাব দেখা যায়।

তদন্ত কমিটি মনে করে, নয়ন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গত ২ জুন ভোরে ব্যাপক মাইকিং করা হয়েছে এবং ওই দিন বিভিন্ন স্থান থেকে ইঞ্জিন বোটে বাঙালি জনগোষ্ঠীর লোকজন লংগদুতে আসে। ফলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ২ জুন পাহাড়িদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। লংগদুতে বিভিন্ন সময় পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সহিংস হানাহানির কারণে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের মনোভাব সব সময় বিরাজ করে। ওই সব ঘটনার বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়নি বলে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY