জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে

671
একটি ছোট পাহাড়ে রোহিঙ্গা শিবির। টেকনাফ ও উখিয়ার এ রকম বহু পাহাড়ের গাছ ও মাটি কেটে শিবির তৈরি করা হয়েছে। এখানে বসবাসকারীদের রান্নার কাঠও আসছে বন থেকে l রয়টার্স

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড় কেটে, বন ধ্বংস করে একের পর এক রোহিঙ্গা শিবির গড়ে তোলা হচ্ছে। যে এলাকায় এই শিবিরগুলো গড়ে উঠছে, সেখানে ছিল বন্য প্রাণীদের বসতি। রোহিঙ্গা শিবিরগুলো ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বন বিভাগ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও রোহিঙ্গা শিবিরের কারণে বন ধ্বংসের কথা বিভিন্ন সময় জানিয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণেও জীববৈচিত্র্য হুমকির চিত্র নানাভাবে উঠে এসেছে।

সর্বশেষ কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা শিবির স্থাপন নিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের (ইউএনডিপি) ‘দ্রুত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বসতি গড়ে ওঠার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সেখানে কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসভূমি চিরতরে হারিয়ে যাবে। বন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না। আর ভূমির ক্ষতিও অল্প সময়ে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও এখন বড় হুমকি।

ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের শিবিরগুলো প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন স্বীকৃত তিনটি এলাকার প্রকৃতি ধ্বংস করছে। এগুলো হচ্ছে টেকনাফ উপদ্বীপের উপকূল এলাকা, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপ। এ ছাড়া শিবিরগুলোর কাছে আছে দুটি সংরক্ষিত এলাকা—হিমছড়ি ন্যাশনাল পার্ক ও টেকনাফ অভয়ারণ্য। প্রস্তাবিত ইনানি ন্যাশনাল পার্কও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে গোটা এলাকায় ১ হাজার ১৫৬ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে। গুরুত্বপূর্ণ বন্য প্রাণীর তালিকায় আছে হাতি, হরিণ, ছোট ভারতীয় বনবিড়াল, বড় ভারতীয় বনবিড়াল ও বন্য শূকর। এর মধ্যে হাতি খুব বিপন্ন এবং হরিণ বিপন্ন পরিস্থিতিতে আছে। দুই প্রজাতির বিড়াল প্রায় ঝুঁকিতে। বন্য শূকর নিয়ে উদ্বেগ কম।

জাতিসংঘের এই সংস্থা বন, ভূমি, পানি, প্রাণ প্রজাতি, মানুষের স্বাস্থ্য—এসব বিষয়ে ২৮টি উচ্চ ঝুঁকি চিহ্নিত ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ৫৪টি সুপারিশ করেছে। সম্প্রতি ইউএনডিপি মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারকে পর্যাপ্ত সম্পদের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে, যেন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শেষ হলে ধ্বংস হওয়া পরিবেশ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন  বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে, সে সম্পর্কে মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগ সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়দায়িত্ব আছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। তাদের সরিয়ে নিলে ওই জায়গায় বনায়ন করা হবে। আর এখন যেন তারা বন থেকে কাঠ কেটে না আনে, সে জন্য শিবিরগুলোতে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইনে গত ২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরুর পর থেকে রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছে। টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার ৪ হাজার ৩০০ একর পাহাড় ও পাহাড়ি এলায় তাদের বসতি গড়ে উঠেছে।

জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে পালিয়ে আসা নতুন রোহিঙ্গার সংখ্যা ৬ লাখ ৫৫ হাজার। আর নতুন-পুরোনো মিলিয়ে এখন শুধু কক্সবাজারেই আছে ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা। এই দুই উপজেলায় স্থানীয় বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। ছোট ছোট পাহাড় ও টিলার বন কেটে রাতারাতি রোহিঙ্গা শিবির তৈরি করা হয়েছে। একটি এলাকার জনসংখ্যা হঠাৎ দ্বিগুণ হওয়ায় পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে কয়েক মাস ধরে অনুমাননির্ভর কথা বলা হচ্ছিল।

প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে জড়িত ইউএনডিপির কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রোহিঙ্গা শিবির এলাকার পরিবেশের ভিত্তিমূলক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করা; বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিবেশগত প্রভাব চিহ্নিত করা এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও দাতাদের করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ তৈরির উদ্দেশ্যে ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

 কী আছে এই অঞ্চলে

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পাহাড় আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পাহাড়ি এলাকা ও টেকনাফ উপদ্বীপ পরিযায়ী পাখির আন্তর্জাতিক উড়ালপথের অংশ। মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলেশিয়ার মধ্যকার উড়ালপথের মাঝে এই অঞ্চল। দীর্ঘ পথ ওড়ার পর এখানে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে পাখিরা পূর্ব থেকে পশ্চিমে বা মৌসুমিভেদে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে উড়ে যায়। এই বিশ্রামের পরিবেশ নষ্ট হলে পাখিরা এই আন্তর্জাতিক পথ ছেড়ে দেবে। এতে কিছু প্রজাতির পাখি বিপন্ন হবে।

ইউএনডিপির প্রতিবেদন বলছে, সমুদ্র উপকূল ও পাহাড় একই সঙ্গে থাকায় এই অঞ্চল জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এই বৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করে। এই এলাকায় আছে বহু প্রজাতির উদ্ভিদ। এর মধ্যে ১৪৩ বৃক্ষ, ১১৩ গুল্ম, ১৮৪ তৃণলতা, ৮৭ লতা ও এক প্রজাতির পরজীবী উদ্ভিদ। এ ছাড়া আছে ১৯৮ প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী, মাছ ৪৮, উভচর ২৭, সরীসৃপ ৫৪, পাখি ২৪৩ ও স্তন্যপায়ী ৪৩ প্রজাতির।

 উদ্বেগ

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার সময় সঙ্গে করে তেমন কিছুই আনেনি। ঘর তৈরির জন্য তারা যা সামনে পেয়েছে, তা-ই সংগ্রহ করেছে। বাছবিচারহীনভাবে পাহাড় ও বন পরিষ্কার করে উপকরণ সংগ্রহ করেছে। প্রতিদিনের রান্নার জন্য রোহিঙ্গারা বন থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছে।

অক্টোবরের মাঝামাঝি টেকনাফ ও উখিয়ার ১০টির বেশি রোহিঙ্গা শিবির ও তার আশপাশ ঘুরেছিলেন  প্রতিবেদক। তখন দেখা যায়, অনেক ছোট ছোট টিলা একেবারে ন্যাড়া। কিছু টিলায় রোহিঙ্গাদের প্রথমে শিবির গড়তে দেওয়া হয়। পরে তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, টিলা শূন্য পড়ে আছে। ১০ দিনের সফরে প্রায় প্রতিদিনই শিবিরগুলোর পাশে জ্বালানি কাঠ বিক্রি হতে দেখা গেছে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, সব কাঠই আসছে বন থেকে। স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও গাছ কাটছে।

ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিবির তৈরি করতে জমি পরিষ্কার করা হয়েছে, সেবা দেওয়ার জন্য রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, পানির কূপ ও শৌচাগার করা হয়েছে। এতে বন ধ্বংসের পাশাপাশি ভূমিক্ষয় হচ্ছে। ছোট ছোট নালা বন্ধ হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের শিবিরের বাইরে আসা নিষেধ থাকলেও তারা তা মানছে না। বেআইনিভাবে বন্য প্রাণী শিকার বেড়েছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের দেশি প্রতিনিধি ইশতিয়াক উদ্দীন আহমেদ  বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বন্য প্রাণীর আবাসভূমি নষ্ট হচ্ছে। রোহিঙ্গা বসতি হাতি চলাচলের পথের জায়গা দখল করে হয়েছে। এতে হাতির আবাসভূমি ক্ষতিগ্রস্ত ও টুকরো টুকরো হয়েছে। দিন যত যাবে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, ঝুঁকি আরও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউএনডিপির এই মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকার প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে বালুখালীতে রাস্তার পাশে চোখে পড়ে ‘সাবধান! হাতি চলাচলের পথ’ লেখা সাইনবোর্ড। আইইউসিএন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল। ওই সাইনবোর্ডের কয়েক শ গজের মধ্যে বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির। আর হাতি চলাচলের পথের ওপর তৈরি করা হয়েছে ৫০ শয্যার হাসপাতাল। অক্টোবরে হাতির আক্রমণে একাধিক রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়।

ইউএনডিপির প্রতিবেদনের একাধিক অংশেই হাতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এশিয়ার হাতি বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন, বাংলাদেশে এই হাতিগুলো মহাবিপন্ন। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে হাতি চলাচলের তিনটি পথ আছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এই দক্ষিণ বন বিভাগের জমিতে। কিছু শিবির এই হাতির পথের ওপর তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে হাতি চলাচলের পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে যাবে। হাতিগুলো গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়বে। এতে তাদের জিন ভিত্তি (জেনেটিক বেস) সংকীর্ণ হবে। একসময় এই অঞ্চল থেকে এই প্রজাতির হাতি বিলুপ্ত হবে।

প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প জ্বালানি কর্মসূচি গ্রহণ, শিবিরে হাতির প্রবেশ ঠেকাতে গাছ, বাঁশ ও বিদ্যুৎবাহী তারের বেড়া তৈরি, বন ধ্বংস হওয়া এলাকায়, ন্যাড়া পাহাড়ে, বাতিল হওয়া শিবিরের জায়গায় বনায়নের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

ইউএনডিপি বলছে, সরকার ছোট ছোট ক্যাম্প গুটিয়ে কুতুপালং ও বালুখালী এলাকায় বড় ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের রাখার পরিকল্পনা করছে। এ উদ্যোগ হয়তো ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বাস্তবসম্মত। তবে পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে তা স্পর্শকাতর।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY