ভোটের আগে সংসদ ভেঙে সহায়ক সরকারের প্রস্তাব
* সংলাপের পর আশাবাদী ফখরুল
বিএনপির সঙ্গে সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, জিয়াউর রহমান এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বে আবারও সরকার গঠিত হয়। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে প্রকৃত নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল রোববার সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে মেয়াদ শেষের ৯০ দিন আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। পরে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘কমিশনের কিছু করার না থাকলেও এ সংলাপের পর আমরা আশাবাদী।’
সংলাপে বিএনপি মোট ২০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে এখন থেকেই সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তৈরি, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে ভোটের অন্তত সাত দিন আগে মোতায়েন করা, ই-ভোটিং না রাখা, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব কমিশনারকে অন্তর্ভুক্ত করা, সংসদীয় আসনের সীমানা ২০০৮ সালের আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া অন্যতম। জবাবে সিইসি কে এম নুরুল হুদা বিএনপির প্রতিনিধিদের বলেছেন, তাঁরা বসে আলোচনা করে দেখবেন এসব ব্যাপারে কী করা যায়।
সিইসি সূচনা বক্তব্যে বিএনপি ও এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করেছে, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে। র্যাব, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন কমিশন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩০ বছর করেছে।
সিইসি বলেন, এই সংলাপে বিএনপি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। দেশের মানুষ এই সংলাপের দিকে তাকিয়ে আছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে গতকাল সংলাপে অংশ নেয় বিএনপির প্রতিনিধিদল l ছবি: প্রথম আলোসংলাপ শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে খুব বেশি কিছু করার ক্ষমতা নেই। তারপরও এই সংলাপের পর বিএনপি কিছুটা আশাবাদী। তিনি বলেন, বিএনপি বলেছে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের অন্যতম নিয়ামক শক্তি হচ্ছে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দক্ষ নির্বাচন কমিশন। কমিশন সম্প্রতি নির্বাচনী রোডম্যাপ বা পথনকশা করেছে। এই রোডম্যাপ নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা থাকলেও বিএনপি আপাতত কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।
গতকাল বেলা ১১টায় সংলাপ শুরু হয়। চলে ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। বিএনপির ১৭ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। অন্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান, এম কে আনোয়ার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ। সিইসির সভাপতিত্বে সংলাপে চারজন কমিশনার ও ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সংলাপে লিখিত বক্তব্যে বিএনপি বলেছে, তারা বিশ্বাস করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন আন্তরিক হলে বিএনপির প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে চায়। বিএনপি বিশ্বাস করতে চায়, নির্বাচন কমিশনের সংলাপ, পথনকশা নিছক কালক্ষেপণ বা লোকদেখানো হবে না।
সংসদ ও সহায়ক সরকার প্রসঙ্গ
বিএনপির ২০ দফা প্রস্তাবের অন্যতম হলো নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার গঠন ও নির্বাচনের ৯০ দিন আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া। বিএনপির যুক্তি, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দলীয় সরকারের এমন ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রশাসনের দ্বারা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন একেবারেই অসম্ভব। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে তা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনেই করতে হবে। বিএনপি শিগগিরই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, সহায়ক সরকার ও সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা বর্তমান সংবিধানে নেই। এখন কমিশন যদি মনে করে বিএনপির এই দাবি যৌক্তিক, তাহলে তারা সরকারকে বলতে পারে। এটা কমিশনের প্রতি সব দলের আস্থা বাড়াবে।
তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, সহায়ক সরকার বলে কিছু নেই, অন্য কোনো দেশেও নেই। তাই এটা হবে না। আর সংসদ ভেঙে নির্বাচন করতে হলে আবার সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। আগামী নির্বাচনের আগে সংবিধান সংশোধন হবে, এমনটা তিনি মনে করেন না।
সরকারের সঙ্গে সংলাপ
বিএনপি বলেছে, নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংলাপের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে।
বিএনপির এ প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে সরকারি দলের নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিএনপি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপ করেছে। তাদের কথা বলেছে, এটা ভালো। কিন্তু এখন তাদের সঙ্গে সরকারের সংলাপ করার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই, কারণও নেই।
এ ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার, গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ এবং এখন থেকেই সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশসহ স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি।
প্রশাসন
সংলাপে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে বিএনপি। দলটি সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং দলীয় আনুগত্যে কাজ করেছেন এমন বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নির্বাচনী কোনো দায়িত্ব না দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। বিশেষ করে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পুলিশের সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার ও বদলি করার কথা উল্লেখ করে বিএনপি বলেছে, দক্ষ ও কর্মে সৎ এমন পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের এসব পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দলটির দাবি, পাঁচ বছর একই জেলা বা মহানগরে কাজ করা কর্মকর্তাদের ভোটের সময় ওই জেলায় নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বিএনপি বলেছে, নির্বাচনের ৯০ দিন আগে থেকে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, অর্থ, তথ্য, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পররাষ্ট্র, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবে। নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে।
আইন ও বিধি সংশোধন
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘প্রতিরক্ষা বাহিনীকে’ অন্তর্ভুক্ত করা এবং নির্বাচনের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনী আসনে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত করার প্রস্তাব করেছে বিএনপি।
এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তাদেরও বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন
বিএনপির প্রস্তাব, ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধি, র্যাবের প্রতিনিধি, আনসার-ভিডিপির কর্মকর্তা, কোস্টগার্ড ও বিজিবির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রতিটি জেলায় ও মেট্রোপলিটন এলাকায় একটি করে কমিটি গঠন করতে হবে। আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের নিজ এলাকায় মোতায়েন করা যাবে না। কমিউনিটি পুলিশকে নির্বাচনী দায়িত্বে রাখা যাবে না।
অন্যান্য প্রস্তাব
বিএনপির অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, প্রত্যাহার ও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কমপক্ষে ৫০ দিন সময় দেওয়া, ভোট গণনা শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা প্রার্থীদের এজেন্টকে ফলাফল না দিয়ে ভোটকেন্দ্র ত্যাগ না করা, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি, নির্বাচনের ১২ মাসের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন না দেওয়া, প্রবাসীদের ভোটার করা, ভোটার হওয়ার যোগ্য কারাবন্দী নাগরিকদের তালিকাভুক্ত করা, বন্ধ গণমাধ্যম চালু করা, নির্বাচনের দিন মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক চালু রাখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ব্যালটে জলছাপ রাখা, নির্বাচনে কালোটাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া ভিডিও চিত্র, স্থিরচিত্র এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও তথ্য নির্বাচন-সংক্রান্ত অপরাধের সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাবও দিয়েছে বিএনপি।
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির দাবিগুলো তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে কিছু আছে রাজনৈতিক দাবি, কিছু সুপারিশ এবং কিছু অস্পষ্ট দাবি। তিনি বলেন, সংসদ ভেঙে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, এটা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে নেই। এখানে ইসি কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সংজ্ঞায় আনা উচিত। তবে তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া যায় না। এ ছাড়া ব্যালটে জলছাপসহ কিছু সুপারিশ ভালো হয়েছে। ২০০৮ সালের আগের সীমানায় নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচন কমিশনে দলগুলো সার্বিক আলোচনা করছে। এটা দিয়ে সফল হওয়া কঠিন। সুস্পষ্ট এবং তাদের এখতিয়ারের মধ্যে আছে এমন বিষয়ে আলোচনা হলে সেটা বেশি কার্যকর হতো। তবে বিএনপির যাওয়াটা ইতিবাচক।













