উত্তরার উত্তরণের গল্প

724

উত্তরা গণভবনে দর্শনার্থীদের জন্য যোগ হয়েছে নতুন আকর্ষণ। নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিস ভবনে যোগ হয়েছে। এর মধ্যে রাজকন্যার প্রেমপত্রসহ আরও অনেক কিছুই আছে।

গতকাল শুক্রবার থেকে সাধারণ দর্শকদের জন্য এই সংগ্রহশালা উন্মুক্ত করা হয়েছে। যাঁরা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি দর্শনে যাবেন, তাঁরা এখন জানতে পারবেন অনেক অজানা তথ্য।
১৯৫৬ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সদস্যরা ভারতে চলে যান। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজবাড়িটিকে উত্তরা গণভবন ঘোষণা করেন। তখন থেকে এর পরিচর্যা করত গণপূর্ত বিভাগ। কয়েকবার এখানে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়েছে।

প্রায় ৪৪ একর আয়তনের এই রাজবাড়ির আঙিনায় শতাধিক শতবর্ষী আমগাছ রয়েছে। গত অক্টোবর মাসে এই গাছ কেটে গোপনে পাচার করা হয়। এ নিয়ে প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে প্রশাসনের টনক নড়ে। গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এরপর জেলা প্রশাসন রাজবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। এ সময় তারা রাজবাড়ির অনেক জিনিসের সন্ধান পায়। উত্তরা গণভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সভায় নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) রাজ্জাকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন, এসব জিনিস একটি জাদুঘর অথবা সংগ্রহশালায় রাখা হোক। আলোচনার পর সংগ্রহশালার প্রস্তাব পাস হয়। রাজ্জাকুল ইসলামের নেতৃত্বে সদর ইউএনও জেসমিন আক্তার বানু ও এনডিসি অনিন্দ্য মণ্ডলকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর তাঁরা খোঁজা শুরু করেন দিঘাপতিয়ার রাজার স্মৃতিচিহ্ন, কোথায় কী আছে। জেলা প্রশাসন গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। কারও কাছে রাজবাড়ির কোনো প্রত্নবস্তু থাকলে জমা দিতে বলা হয়। এলাকায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে সিন্দুক, রাজা-রানির ছবিসহ অনেক কিছু। রাজকুমারী ইন্দু প্রভার ব্যক্তিগত একটি ট্রাঙ্ক এই প্রথম খোলা গেছে। সেখানে মিলেছে অজানা অনেক জিনিস।

নাটোর জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন জানান, ইন্দু প্রভার ট্রাঙ্কের ডালার সঙ্গে মনে হচ্ছিল গোপন একটি খোপ আছে। খোলার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখনকার সময়ে পাসওয়ার্ড দিয়ে বন্ধ করে রাখার মতো। তখনই অনুমান করেছিলেন, ওর ভেতরে প্রেমপত্র থাকতে পারে। মিস্ত্রি ডেকে খোলার পরে দেখলেন তাঁর অনুমান সঠিক ছিল। সেখানে চিঠি ও কবিতা পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, তারা তাঁর কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের উদ্যোগ নেবেন। তবে শতবর্ষী কাগজ হাতে ধরতে গেলেই ভেঙে যাচ্ছে। একধরনের ‘মেটেরিয়াল’ পাওয়া যায়, সেটা দিয়ে ধরলে নষ্ট হয় না। এগুলো জোগাড় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কারণে অল্প কিছু চিঠি ও কবিতা আপাতত উন্মুক্ত করা হবে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াজাত করে উন্মুক্ত করা হবে।

সংগ্রহশালার প্রস্তাবক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজ্জাকুল ইসলাম বলেন, প্রথমে তাঁরা সংগ্রহশালার কাজে হাত দিয়েছিলেন। পরে তাঁর মনে পড়ে যায় ১৯৯৭ সালে রাজপরিবারের একজন সদস্য কলকাতা থেকে রাজবাড়ি দেখতে এসে দুঃখ করে বলেছিলেন, রাজবাড়ির বেহাল অবস্থা দেখে আজ যে কষ্ট পাচ্ছেন, সেদিন জমিদারি হারিয়েও তাঁরা এত দুঃখ পাননি। তিনি সে সময় প্রশাসনকে রাজবাড়ির যত্ন নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। রাজ্জাকুল ইসলাম বলেন, সেই চিন্তা থেকেই তাঁরা জঙ্গলাকীর্ণ রানিঘাট ও রানিমহল পরিষ্কার করে নতুন করে রাস্তা বানিয়েছেন। রানির ঘাট মেরামত করেছেন। এগুলোর ভেতরে আগে ঢোকার উপায় ছিল না।

গত বুধবার সেখানে গিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপ লক্ষ করা যায়। স্বয়ং জেলা প্রশাসক স্কাউট দল নিয়ে রাজবাড়ির ময়লা পরিষ্কার করেছেন। কেউ সংরক্ষিত প্রত্নবস্তুর ছবি তুলে আনছেন, কেউ ইংরেজি-বাংলায় নাম লিখছেন। তাঁদের ছোটাছুটির শেষ নেই! ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বেদখল গ্র্যান্ড মাদার হাউস উদ্ধার করে দর্শকদের জন্য পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে। লেকের ঘাটে বসার নতুন কিছু জায়গা করা হয়েছে। ল্যাডিস পার্কে যেখানে রানি অবসর সময় কাটাতেন, সেখানে পশুপাখির খাঁচা ঠিক করা হয়েছে। খাঁচায় দুটি হরিণ। পাশের খাঁচায় ময়ূর রাখার প্রস্তুতি চলছে। রাস্তার পাশে ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। আজ থেকে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হবে দিঘাপতিয়ার অজানা অধ্যায়।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY