আজ প্রথম আলোর ১৯ বছর পূর্ণ হলো। এই ১৯ বছর ধরে আমরা পতন-অভ্যুদয় মিলিয়ে বন্ধুর পথে চলেছি। এই যাত্রাপথে আমাদের সফলতা যেমন আছে, তেমনি ভুলত্রুটিও রয়েছে। আমাদের চলার পথে অনেক বাধাও পেরোতে হয়েছে। অনেক সময় আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। নানামুখী অপপ্রচার আর নিন্দা হয়েছে। চাপ এসেছে, ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। মামলা হয়েছে অনেক। এ সবকিছুর পরও প্রথম আলো তার নিজস্ব লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমআরবির (মার্কেট রিসার্চ ব্যুরো) বাংলাদেশের জাতীয় তথ্যমাধ্যম নিয়ে করা সর্বশেষ সমীক্ষা (ন্যাশনাল মিডিয়া সার্ভে ২০১৬) অনুযায়ী, দেশের ভেতরে প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণ দৈনিক পাঠ করেন ৫৩ লাখ পাঠক। বাংলাদেশে প্রথম আলোর পাঠকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের ২০০টির অধিক দেশ ও অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী পাঠকেরা অনলাইনে প্রথম আলো পাঠ করছেন। এ সংখ্যা প্রতিদিন ১২ লাখ। সারা বিশ্বের সব ধরনের বাংলা ওয়েব পোর্টালের মধ্যে প্রথম আলোর অবস্থান শীর্ষে। বাংলাদেশে ফেসবুক পেজে অনুসারীর দিক থেকেও আমরা এক নম্বর; আমাদের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। এসব সাফল্য আমাদের যেমন অনুপ্রাণিত করে, তেমনি সব পাঠকের প্রতি আমাদের দায়িত্বও বাড়িয়ে দেয়। সে জন্য প্রথম আলোর লক্ষ্য ও আদর্শ স্বাধীন সংবাদ ও সংবাদপত্র প্রকাশ করা। আমরা প্রতিনিয়ত তা মেনে চলার চেষ্টা করি। যত প্রতিকূল অবস্থাই আসুক না কেন, স্বাধীন সংবাদ ও সংবাদপত্র প্রকাশের কাজ আমরা অব্যাহত রাখব।
প্রথম আলো প্রকাশের শুরুতে যেমন, তেমনি আজও আমরা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের আন্দোলন এবং পরে আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের শিক্ষাকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছি।
১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমার গভীরভাবে মনে পড়ছে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির কথা। এর আগে, ৩০ জানুয়ারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রধর্মঘট পালিত হয়েছিল। এই আয়োজনের উদ্যোগ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের। সেদিন তুমুল বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন-অঙ্গন ও মধুর ক্যানটিনের আশপাশ। প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল। সেই সমাবেশ-মিছিলে আমিও অংশ নিয়েছিলাম। তখন আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। সেদিনের সেই ধারাবাহিকতায় পরদিন, তার পরদিন ক্রমাগতভাবে আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছিল। এই আন্দোলনের প্রেরণা আমরা পেয়েছিলাম ভাষা আন্দোলন থেকে; যার মর্মবাণী-একুশ মানে মাথা নত না করা।
এই সময়কালের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও দাবিগুলোর কথা মনে পড়ে-সামরিক শাসন বাতিল করো, গণতন্ত্র চাই, নির্বাচন চাই, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চাই, বাক্স্বাধীনতা চাই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই, বাঁচার মতো বাঁচতে চাই প্রভৃতি।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে বাষট্টির সেপ্টেম্বরে শিক্ষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। আন্দোলনের উত্তাপ ঢাকার পাশাপাশি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে প্রকম্পিত করে দিয়েছিল। এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল সে সময়ের সংবাদপত্রগুলোর।
আমরা ছাত্রকর্মীরা ’৬২ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত দেশব্যাপী চলমান সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলাম। ওই সব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। এর মধ্যে ছেষট্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সুনির্দিষ্টভাবে ছয় দফা প্রস্তাব তথা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের তুমুল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ফলে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন আরও বেগবান হয়। সে সময় ধারাবাহিকভাবে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে গণতন্ত্র আর স্বাধিকারের সংগ্রাম উত্তাল হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনই উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। কী এক তুমুল উত্তেজনাকর অসাধারণ সময়ে আমরা সক্রিয় ছিলাম। সে বছরের ১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারির সেই আন্দোলনের কথা, আমাদের যৌবনের ষাটের দশকের উত্তাল সময়ের কথা, সে সময়ে আমরা যারা ছাত্রকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম, তাদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে আছে। এই আন্দোলনের সময় আগের সেই দাবিগুলো আরও বেশি বেশি উচ্চারিত হয়েছে-নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই, ভোটের অধিকার চাই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই, কথা বলার অধিকার চাই এবং আরও অনেক দাবি।
তিন.
পুরো ষাটের দশকে অব্যাহত সেই সব ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফলে সত্তরে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসনাধীন থাকতে চায় না। বিশ্বব্যাপী মানুষ জেনে যায়, স্বাধিকারের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। তারা আর পরাধীন থাকতে চায় না। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। বাঙালি নেতৃত্বের কোনো দাবিই মানেনি। বঙ্গবন্ধুর একাত্তরের সাতই মার্চে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এর ডাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। এ পুরো সময়ে ব্যাপক প্রতিকূলতা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংবাদপত্রগুলো নানা উদ্দীপনামূলক সংবাদ ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের পাশাপাশি বেতারের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নতুন করে আবার শুরু হয় ‘আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। আমাদের মনে আছে, স্বাধীন বাংলাদেশে নানা সীমাবদ্ধতা-সংকটের মধ্য দিয়েও এগিয়ে চলছিল। নানা সমস্যা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছিল। সংবিধান রচিত হয়েছিল দ্রুত। সাধারণ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়। শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসবের সঙ্গে সঙ্গে নানা কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি হচ্ছিল।
স্বাধীনতার তিন বছরের শেষে জরুরি আইন ও একদলীয় শাসন কায়েম হওয়ায় পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। আমরা পতিত হই ঘোর অন্ধকারে।
স্বাধীন বাংলাদেশ আবার চলে যায় সামরিক শাসকের হাতে। মানুষ নতুন দেশে নতুন করে সামরিক শাসকের হাতে পিষ্ট হতে থাকে। অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানও হতে থাকে। নির্বাচন হলেও গণতন্ত্র অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। ’৮২-তে আবার সামরিক শাসন জারি হয়। শাসনভার চলে যায় নতুন এক সামরিক জান্তার হাত থেকে আরেক জান্তার হাতে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলাকালে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন শহীদ হন। রাজনীতিক, ছাত্র, সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীরা এক হয়ে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’-এই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হন। জেল-জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে তাঁরা আন্দোলনে অংশ নেন। এ সময় সেই আগের দশকের স্লোগানগুলোও উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয়। আন্দোলন বেগবান হয়। দাবিগুলো প্রায় অভিন্নই ছিল-নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই প্রভৃতি। এর পাশাপাশি যেসব চেতনার ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিলাম, তার বাস্তবায়নও আমরা চাই। দেশবাসীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদায় নেয় স্বৈরশাসক। আমরা দাবি আদায়ের অনেকটাই লক্ষ্যে পৌঁছে যাই। আমাদের গণতন্ত্রের মুক্তির পথ খুলে যায়।
’৯০-এর গণ-আন্দোলনের পুরোটা সময় নানামুখী চাপ সত্ত্বেও সংবাদপত্র এবং সাংবাদিক নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল সাহসী ও অনুপ্রেরণামূলক। পত্রপত্রিকার গণমুখী ভূমিকার কারণে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন পেশাজীবীরা।
১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ফিরে আসে গণতন্ত্র। বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাধারণ নির্বাচন নিয়ে দেশে গভীর সংকট তৈরি হলে ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে সুষ্ঠু একটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে। সেই নির্বাচনটি সুষ্ঠু হওয়ার পেছনেও দেশের সংবাদমাধ্যমের বড় ভূমিকা ছিল।
এত দিন পর অর্থাৎ ২৭ বছর পরও আবার নির্বাচন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ২০১৪ সালে একতরফা সাধারণ নির্বাচনও আমাদের দেখতে হয়েছে। আগামী সাধারণ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। অপহরণ, গুম ও রাজনৈতিক হত্যা থামছে না। ফলে আমাদের মনে পড়ছে সেই ’৬২-র আন্দোলনের দাবিগুলোর কথা। মনে পড়ে যাচ্ছে, ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের কথা এবং ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের দাবি ও আকাঙ্ক্ষার কথা। সেই সময়ের স্লোগান আর দাবিগুলোর প্রাসঙ্গিকতা এই সময়েও যেন বারবার ফিরে ফিরে আসছে।
চার.
গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা স্বাবলম্বী হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে, মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বেড়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক খাতে ও নারীর ক্ষমতায়নে অনেক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আমরা সারা বিশ্বের সম্মান-স্বীকৃতি পাচ্ছি। ক্রিকেটের বিজয়-সাফল্য আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আমরা সব সময় বলি, বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এ যাত্রা অব্যাহত থাকবে, সেই প্রত্যাশা আমরা করি। আমাদের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের কর্তব্য এই অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সে জন্য আমরা বলি, আমরা বাংলাদেশের জয় দেখতে চাই।
নানা সমস্যা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামনে এখন অনেক সম্ভাবনা। সামনের দশক আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য দেশবাসী একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, সুপ্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী নির্বাচনব্যবস্থা, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেখতে চায়। এসব বিষয়ে গোটা জাতি যাতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এখানে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্ব রয়েছে দেশের নাগরিক সমাজের, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরও। সেখানে অবশ্যই সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র, সুশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের প্রশ্নে আমাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। সংবাদপত্র বা প্রচারমাধ্যমকে চাপের মধ্যে থাকতে হয়, ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়। সংবাদপত্রের প্রধান আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন নিয়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এসব সমস্যার মধ্য দিয়ে এখনো আমাদের চলতে হচ্ছে। অথচ স্বাধীন সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম ছাড়া কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কোনো সমাজে সংবাদপত্র কতটা স্বাধীনতা ভোগ করে, সেটি তার গণতন্ত্রেরও পরিমাপক।
এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ দেশের সাংবাদিক থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষমতাধর-আমরা সবাই দেশে একটা সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা চাই। কার্যকর সংসদ দেখতে চাই। সর্বক্ষেত্রে সুশাসন দেখতে চাই। জীবন আরও সহজ-সুন্দর হোক, সাধারণ মানুষ সেটা চায়। নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই, কথা বলার অধিকার চাই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই-মানুষের মনে এই আকাঙ্ক্ষাগুলো বারবার ফিরে ফিরে আসছে।
সবশেষে আমরা আবার পরিষ্কার বলতে চাই, প্রথম আলো তার মূল আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও আপসহীনতা অব্যাহত রাখবে। আমরা স্বাধীন ও আপসহীন সাংবাদিকতা করতে চাই। আমরা মনে করি, পাঠকের কাছে আমাদের জবাবদিহিও থাকতে হবে। আমাদের মানুষের বিজয়ের গল্প, সাফল্যগাথা লিখতে চাই। নতুন নতুন উদ্যোগের কথা, প্রতিষ্ঠানের সফলতার কথা, রাষ্ট্রের সফলতা কথাও মানুষকে জানাতে চাই। এসব নিয়েই সাহসের ১৯ বছরের পর আগামীতেও আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই।
পাঁচ.
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬ ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম জনমানুষের পক্ষে যে গর্বিত ভূমিকা পালন করেছিল, ভবিষ্যতেও দেশ ও সমাজের স্বার্থে সংবাদপত্র, প্রচারমাধ্যম ও সাংবাদিকেরা সেই স্বাধীন ও সাহসী ভূমিকা রাখবে।
প্রিয় পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা ও বন্ধুদের উদ্দেশে আমরা আজ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, প্রথম আলো ১৯ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও আপসহীনতা-এসব চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। আমরা আমাদের লক্ষ্যগুলো থেকে কখনো বিচ্যুত হব না।













