অসুস্থ শিশুকন্যাকে হাসপাতালে নিতে সকাল সাতটার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে বের হলেন সেলিনা রহমান। অদূরে মোড়েই সিএনজিচালিত দুটি অটোরিকশা পেলেন। একটির চালককে বললেন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে যেতে হবে। ভাড়া কত?
চালক হাঁকলেন ২০০ টাকা। সেলিনা বললেন, ১৫০ টাকা। চালক রাজি হলেন না। আর ওই চালকের পেছনে থাকা অন্য অটোরিকশার চালককে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলতেই ‘না’ বলে দিলেন। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন? তাই সর্বোচ্চ দুই কিলোমিটারের ওই পথ ২০০ টাকা দিয়েই যেতে হলো তাঁকে।
রাজধানীর সিএনজিচালিত অটোরিকশাযাত্রীদের কাছে এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিদিনের শত শত ঘটনার একটিমাত্র খণ্ডচিত্র এটি। অথচ ২০১৫ সালে সর্বশেষ বৃদ্ধি করা ভাড়া অনুযায়ী ওই অটোরিকশার প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া হওয়ার কথা ৪০ টাকা। বিরতিকালীন চার্জ প্রতি মিনিট ২ টাকা হিসেবে ধরে ভাড়া আর কিছুটা বাড়তে পারে।
২০০১ সালে রাস্তায় নামা ওই অটোরিকশাগুলোর ভাড়া এ পর্যন্ত পাঁচ দফায় বাড়ানো হয়েছে। মালিকের জমা বেড়েছে চার দফা। আর অটোরিকশার মেয়াদ বেড়েছে তিন দফা। প্রতিবারই প্রতিশ্রুতি ছিল যাত্রীদের কাছ থেকে মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করবে না। কিন্তু কোনোবারই সেটা মানা হয়নি। এখন অটোরিকশার মালিকদের নতুন ‘আবদার’ আরও ছয় বছর মেয়াদ বাড়াতে হবে অটোরিকশাগুলোর। ৯ বছর মেয়াদ ধরে আমদানি করা অটোরিকশাগুলো ইতিমধ্যে সেই মেয়াদের চেয়ে অতিরিক্ত ছয় বছর পার করেছে। আরও ছয় বছর বাড়লে এগুলোর মেয়াদ হবে ২১ বছর! তবে এই ‘দাবি’ আদায়ের লক্ষ্যে বেশ কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে অটোরিকশা মালিক সমিতি। এ জন্য ধর্মঘটের হুমকির পাশাপাশি কোটি টাকার তহবিলও সংগ্রহ করেছে তারা। সেই তহবিলের জোরে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনের ফাইল নাকি বিভিন্ন দপ্তরে ছুটছে বুলেট গতিতে!
মিটারে না চলার বিষয়ে অটোরিকশার মালিকপক্ষ আর চালকপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করে। চালকদের অভিযোগ, মালিকেরা তাঁদের কাছে সরকারের নির্ধারিত জমার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা জমা নেন, তাই মিটারে চলা তাঁদের পোষায় না। অনেক অটোরিকশার তো মিটারই থাকে না। ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি নেওয়া ওই অটোরিকশা নির্বিঘ্নে ভাড়ায় চলছে। মালিকপক্ষ চালকদের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলে, চালকেরা নিজেরাই যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া নেন। কিন্তু দোষ যারই হোক, যাত্রীর যে পকেট কাটা যাচ্ছে, এটা তো নিশ্চিত! আর শুধু কি তা–ই। বিশেষজ্ঞের মতে, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এই অটোরিকশাগুলো একেকটি “চলন্ত বোমায়” পরিণত হয়েছে। যার কারণে যাত্রী তো বটেই, চালকদেরও মৃত্যুঝুঁকি থাকছে। তারপরও প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীকে জিম্মি করে যারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে, বিআরটিএ, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবাই কি তাদের পক্ষেই থাকবে? তাহলে সাধারণ যাত্রী আমরা কোথায় যাব?’
মানুষের চলাচল সহজ করার জন্য পরিবহন খাতে সরকারের নানা উদ্যোগ চোখে পড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো কার্যকর হতে দেখা যায় না গোষ্ঠীস্বার্থের কারণে। অটোরিকশার ক্ষেত্রেও মেয়াদ বাড়ানো হলে মালিকপক্ষের স্বার্থ নিশ্চিত হবে। আর প্রতিদিন সাধারণ যাত্রীদের ‘পকেট কাটা’ চলতে থাকবে। হয়তো যাত্রী হিসেবে ‘চলন্ত বোমায়’ (মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশা) ওঠার পর বিস্ফোরণে প্রাণও যেতে পারে। কিন্তু সেদিকে কারও নজর নেই। যাত্রীদেরও যেন কিছুই করার নেই!
আগে কোনো কোনো সিএনজিচালিত অটোরিকশার পেছনে লেখা দেখতাম ‘আমি ছোট, আমাকে মেরো না’। কে কী ভেবে এমনটা লিখেছে, তা অবশ্য জানা যায় না। তবে এখন বোধ হয় রাজধানীর অটোরিকশার যাত্রীদের স্বগতোক্তি এটাই, ‘আমি ছোট, আমাকে মেরো না’!













