সৌদি রাজপ্রাসাদে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। গত জুলাই থেকেই প্রাসাদের ভেতরের অস্থিরতা নিয়ে গুজব-গুঞ্জন ছিল।
এর আগের মাসেই প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফের কাছ থেকে ‘যুবরাজ’ পদবিটি কেড়ে সে আসনে নিজ অবস্থান পোক্ত করেন মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস নামেই রিয়াদে অধিক পরিচিত)। গুঞ্জন ছিল, প্রাসাদে তাঁর বিরোধীরা বিদ্রোহের (পড়ুন অভ্যুত্থান) জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছে। তবে শনিবার রাতে যা ঘটল তাতে স্পষ্ট যে বিদ্রোহের আগেই তোপ দেগে ফেলেছেন এমবিএস।
তবে এই ‘তোপের’ আঁচে প্রিন্স সালমানের গায়েও ফোস্কা পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। সৌদি সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা শুরু হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে শেয়ারের দাম পড়ছে হু হু করে। সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ত্রিধাবিভক্ত সৌদি রাজপরিবার, যেখানে বাদশাহ সালমান তাঁর প্রিয় পুত্রকে নিয়ে একা দাঁড়িয়ে। বাকি দুটি ভাগই তাঁদের বিরুদ্ধে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি শীর্ষ সূত্র হংকংভিত্তিক ইংরেজি ভাষার দৈনিক এশিয়া টাইমসকে জানিয়েছে, শনিবারের ‘ঘটনা যতটা সামনে এসেছে তার চেয়ে মূল বিষয়টি অনেক বেশি গুরুতর।
পূর্ববর্তী বাদশাহ আবদুল্লাহর দুই ছেলে প্রিন্স মিতাব ও তুর্কিকে গ্রেপ্তার করা মারাত্মক ভুল হয়েছে। এটা স্বয়ং বাদশাহকে বিপদে ফেলবে। বাদশাহ শুধু এমবিএসকে রক্ষার জন্য এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। ’
শুরুতেই বলা হয়েছে, সৌদি সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাত্রা হিসেবে ‘অস্থিরতা’ শব্দটি ভুল। ‘নিজের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পুরো সেনাবাহিনীকেই কারারুদ্ধ করতে হবে এমবিএসের। ’ আটকদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো প্রিন্স আল-ওয়ালিদ বিন তালাল। তিনি একাধারে কিংডম হোল্ডিংস, টুইটারের শেয়ারের একটি বড় অংশ, সিটিব্যাংক, ফোর সিজনস, লিফট অ্যান্ডের কর্ণধার।
গ্রেপ্তার তালিকার আরেক প্রিন্স আল-ওয়ালিদের আটকের অর্থই হচ্ছে, তথ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। সৌদিতে এমনিতেই তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা নেই। এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ এমবিএসের হাতে চলে গেছে। তবে সৌদি আরবের বাইরেও গণমাধ্যম রয়েছে। সেগুলোর নিয়ন্ত্রণও হাতে নিতে চাইছেন এমবিএস।
বাদশাহ আবদুল্লাহর পর সৌদি ক্ষমতায় তিনটি স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায়—‘ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়া হয় বাদশাহ সালমান (ও তাঁর আদরের ছেলে প্রিন্স সালমান), প্রিন্স নায়েফের ছেলে এবং মৃত বাদশাহর ছেলে (ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার প্রিন্স মিতেব)। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাদশাহ সালমান পুরো ক্ষমতাই এমবিএসের হাতে তুলে দিয়েছেন। ’ গোলযোগও শুরু হয় ওই সময় থেকেই। সিরিয়ায় ক্ষমতা পরির্তনের জন্য গোষ্ঠীগত প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছিলেন প্রিন্স বান্দার বিন সুলতান। সাফল্য আসছিল। নতুন প্রেক্ষাপটে তাঁর তৎপরতা থেমে যায়। ফলে সিরিয়ায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি রিয়াদ। প্রিন্স সালমানের পরিকল্পনায় শুরু হয় ইয়েমেন যুদ্ধ। এত দিনে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ইয়েমেনে জেতা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তহবিল জোগাড় করতে হচ্ছে সৌদি আরবের। দেশের ভেতরেও ব্যয় সংকোচন চলছে। অথচ এমবিএস ৫০ কোটি ডলার দিয়ে প্রমোদতরি কিনেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। অসন্তোষ আছে শিয়া নেতা শেখ আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে। সুন্নিপ্রধান দেশটির শিয়ারা এতে যেমন খেপেছে, তেমনি সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে ইরানের সঙ্গেও। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমবিএসের ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্প। বলা হচ্ছে, তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কাজের ক্ষেত্র আরো বাড়ানোই এর লক্ষ্য। এর সাফল্যের জন্য ‘উদার ইসলাম’ গ্রহণের কথাও বলেছেন প্রিন্স সালমান, যা গ্রহণ করতে সৌদি রাজপ্রাসাদ প্রস্তুত নয়। এই সব কিছুর মিলিত প্রতিক্রিয়াই হলো, রাজপ্রাসাদের বাইরেও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন প্রিন্স।
ওই সূত্র বলছে, এই দাম্ভিক যুবরাজকে সরাতে ‘অদূর ভবিষ্যতেই হয়তো সৌদি ক্ষমতায় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এখনো এমন কিছু ঘটে যায়নি, তার একমাত্র কারণ বর্তমান বাদশাহকে পরিবারের সবাই খুব পছন্দ করে। ’ সূত্র : এশিয়া টাইমস।













