রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

613

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা ‘গণহত্যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ’। গণহত্যা কোনোভাবেই দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। আর রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে রাখাইনে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটামাটিতে ফেরত পাঠাতে হবে। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
রাজধানীতে গতকাল বুধবার ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নীরব গণহত্যার অবসান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে।
ইউরোপে নির্বাসনে থাকা রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘ইউরো-বার্মা অফিসের’ সহায়তায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ (রামরু) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, মালয়েশিয়া, ভারত ও নেপালের মানবাধিকারকর্মী ও বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।

যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকা মিয়ানমারের গণহত্যা বিশেষজ্ঞ মং জার্নির পক্ষে সম্মেলনের সমাপনী প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন পার্লামেন্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়ন্সের ইমেরিটাস চেয়ার ড. মালিক মুজাহিদ। প্রস্তাবে বলা হয়, রোহিঙ্গারা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটামাটিতে যেভাবে নৃশংসতার শিকার হয়েছে তা ‘গণহত্যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তারা তাদের চিরতরে তাড়িয়ে দিতে এটা করেছে। তাই বিশ্বের কাছে গণহত্যা থেকে রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে ও তাদের নিপীড়কদের শাস্তি দিতে এ-সংক্রান্ত সনদ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সম্মেলনের সমাপনী প্রস্তাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব সমর্থন করে রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। গণহত্যাকে কোনোভাবেই দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। আর এই গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞারও দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশকে সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হয়।

এর আগে সকালে সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি রাখাইনে গণহত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানানো হয়। মালিক মুজাহিদ বলেন, ‘গণহত্যা দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয় না। এটা আন্তর্জাতিক বিষয়।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাখাইনের তুলাতলী নামের একটি গ্রামে চার হাজার লোকের মধ্যে ১ হাজার ৭০০ লোককে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে ২৮৮টি গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই গ্রামগুলোর একটি প্যাগোডাও পোড়ানো হয়নি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও রামরুর নির্বাহী পরিচালক সিআর আবরার বলেন, ‘রাখাইনে গণহত্যা চলছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের কাছে প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ আছে, যা আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি। মিয়ানমারের ওপর এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এ বিষয়ে বিরোধিতা করছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘রাখাইনে যা ঘটছে তা পুঁজিবাদের কারণেই হচ্ছে। এতে রাশিয়া, চীন ও ভারতের সমর্থন আছে। রাখাইনের বর্তমান ঘটনার সঙ্গে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মিল আছে।’ তিনি মিয়ানমারের ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের দাবি জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য যে তাকে মিয়ানমারের শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে হচ্ছে।’ ১৯৯৪ সালে নিজের গবেষণা থেকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘১৯৬২ সালে সামরিক বাহিনী মিয়ানমারের ক্ষমতা নেওয়ার আগে রোহিঙ্গারা দেশটির নাগরিক অধিকার ভোগ করত। এখন তাদের হত্যা করে মিয়ানমার সরকার তার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।’
বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাষানচরে সরিয়ে নিতে সরকারের পরিকল্পনার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভুল বার্তা দিতে পারে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আগ্রহী নয়, এমন ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY