প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ

592

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকারের অবস্থা লেজেগোবরে। বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাস্তবতা বারবার অস্বীকার করায় পুরো বিষয়টি এখন সরকারের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরিতে নিয়োগের পরীক্ষা-সব ক্ষেত্রেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। সর্বশেষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে বেশ কিছুদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তারপরও প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রকৃত উৎসমূল বের করা যায়নি। মূল হোতারা তাই এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশের হিসাবে, চলতি বছর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় দুর্নীতি করতে গিয়ে। অন্যরা পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত ছিলেন।
সর্বশেষ ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রসহ আরও আটজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ৮ ডিসেম্বর ও গত মঙ্গলবার তাঁদের প্রত্যেকের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম।
দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এ বিষয়ে তৎপর হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে দুদক গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একগুচ্ছ সুপারিশ পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে কোচিং ও নোট-গাইড বই বন্ধ করাসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে মোট ৪০টি সুপারিশ করেছে কমিশন।
সংস্থাটি বলেছে, শিক্ষা বোর্ড, বিজি প্রেস, ট্রেজারি ও পরীক্ষা কেন্দ্র হলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্ভাব্য উৎস। ওই সব প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির কর্মকর্তার সঙ্গে কোচিং সেন্টার, ‘প্রতারক শিক্ষক’ ও বিভিন্ন অপরাধী চক্র মিলে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে দুদক। দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থাটির মূল্যায়ন হলো পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস দুর্নীতির নতুন সংযোজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাটা কেনাবেচার ব্যাপার হয়ে গেছে। এখন টাকা দিলেই প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়, ফল ভালো করা যায়। এর সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাপার জড়িত। শ্রেণিকক্ষের লেখাপড়ার চেয়ে পরীক্ষার ফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় এমনটি হচ্ছে।
জবাবদিহি না থাকায় প্রশ্নপত্র ফাঁস থামছে না-এমন মত দিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম উপায় হলো অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। সরকার, মন্ত্রণালয় এবং পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব নিতে হবে। সর্বোপরি ফলনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

রাজধানীর ৯০ মামলার হালচাল
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ঢাকঢোল পেটানো হলেও শাস্তি পাওয়ার তেমন কোনো নজির নেই। গত সাড়ে আট বছরে পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কেবল রাজধানীতেই ৯০টি মামলা হয়। এগুলোর মধ্যে এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ১২টি মামলায় সাক্ষীর অভাবে আসামিরা অব্যাহতি পেয়েছেন। বর্তমানে বিচারাধীন অর্ধশত মামলা। তদন্তাধীন ১৯ টি। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় সাতটি মামলার আসামিরা অব্যাহতি পেয়েছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৯০টি মামলার মধ্যে এ বছর দায়ের হয়েছে অন্তত ২০ টি। এর মধ্যে জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ১২টি মামলা হয়েছে।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হলে সবার মধ্যে সংবেদনশীলতা জাগা দরকার। যাঁর যাঁর অবস্থান থেকেই এটি প্রতিরোধ করতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা কঠিন বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে প্রশ্নব্যাংক করা, পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে পরীক্ষা নেওয়াসহ বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সেসব বাস্তবায়নের পথও দুরূহ। কীভাবে তা মোকাবিলা করা যায়, সে জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সচিব বলেছেন, প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নতুন করে গ্রেপ্তার আটজন
এত দিন বিষয়টি নিয়ে জোরালো কোনো তৎপরতা না থাকলেও সম্প্রতি উঠেপড়ে লেগেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা মাঠে নেমে দেখছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় গড়ে উঠেছে একাধিক চক্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রও এতে জড়িয়ে পড়েছেন।
৮ ডিসেম্বর ও গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্র হলেন ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র টি এম তানভির হাসনাইন, শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের সুজাউর রহমান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রাফসান করিম, বাংলা বিভাগের আখিলুর রহমান ও নাজমুল হাসান নাঈম।
এ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলের বনি ইসরাইল, নাটোর ও পাবনা জেলার ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান এবং মারুফ হোসেন নামে এক যুবককে। মঙ্গলবার ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবসহ তিনজনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। বর্তমানে তাঁরা সিআইডির হেফাজতে আছেন।
আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঢাকায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার আট ব্যক্তির জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমন কুমার দাস আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আসামিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তার উত্তরপত্র পরীক্ষা কেন্দ্রে সরবরাহ করে আসছেন। এর ফলে টাকার বিনিময়ে স্বল্প মেধার ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করছেন। মামলার মূল ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও মূল হোতাসহ অন্যান্য সহযোগী আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। এ জন্য আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

প্রশ্ন ফাঁস চক্রে ছাত্র-শিক্ষক
এর আগেও একাধিক চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। সেখানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় একশ্রেণির শিক্ষকেরও জড়িত থাকার প্রমাণ পায় পুলিশ। গত ২৭ মার্চ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আশুলিয়ার গাজীরচট এ এম উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোজাফফর হোসেনসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, যোগসাজশ ও কৌশলে অধ্যক্ষ মোজাফফর হোসেন ও তাঁর অফিস সহকারী সাভার থানা থেকে (সাধারণত থানায় প্রশ্নপত্রের বাক্স রাখা হয়) যেদিন যে বিষয়ের পরীক্ষা হতো, সে বিষয়ের প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি কৌশলে পরবর্তী পরীক্ষার দু-একটি প্রশ্নপত্র নিয়ে আসতেন।
গত নভেম্বর মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে ছাত্রলীগের ২ নেতাসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাঁদের ১০ জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
গত ১৯ অক্টোবর রাতে অভিযান চালিয়ে ছাত্রলীগ নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হল থেকে মহিউদ্দিন রানা ও আবদুল্লাহ আল মামুনকে পুলিশকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন সিআইডির পরিদর্শক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বাদী হয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন এবং ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনে তাঁদের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানজিল, বিকেএসপির সহকারী পরিচালক (বরখাস্ত) অলিপ বিশ্বাস, অলিপের ভাই উৎপল ও জেনিথ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাঁরা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য হিসেবে ইলেকট্রনিক ডিভাইস সরবরাহ করেন। ডিভাইস নিয়ে হলে ঢুকে পরীক্ষার্থীরা তাঁদের কাছে প্রশ্নপত্র পাঠান। চক্রের অন্য সদস্যরা দ্রুত উত্তরপত্র তৈরি করে আবার সেসব পরীক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করেন।
ছাত্রলীগ নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মহিউদ্দিন রানার কাছ থেকে এক আসামি (শিশু বয়স হওয়ায় নাম দেওয়া হয়নি) নির্দিষ্ট ডিভাইস নেওয়ার বিনিময়ে তাঁকে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করে।
তদন্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন ছাত্র গ্রেপ্তার হলেও চক্রের প্রধান অলিপ বিশ্বাস এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হননি। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অলিপ বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা গেলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তির অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

মুন্সিগঞ্জে আটজন গ্রেপ্তার
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আটজনকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। তাঁরা হলেন মো. রতন, মো. রফিকুল, মো. মুস্তাফিজুর রহমান, মো. কামরুল, মো. কাশেম, মো. শাখাওয়াত, মো. রহিম ও মো. রিয়াজ। তাঁরা প্রত্যেকেই মুন্সিগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজের সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী।
মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, আটক হওয়া প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করা হয়েছে।

মোট গ্রেপ্তার ৭১
এ বছর গ্রেপ্তার হওয়া মোট ৭১ ব্যক্তির মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাসংক্রান্ত জালিয়াতির মামলায় গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৩০ জন রয়েছেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জালিয়াতির মামলায় ৬ জন, মুন্সিগঞ্জে ৮ জন, গত অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে করা মামলায় ৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, শাহবাগ থানায় জেএসসি পরীক্ষাসংক্রান্ত মামলায় ২ জন এবং গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষাসংক্রান্ত মামলায় মতিঝিল থানার মামলায় ৯ জন এবং বাকি ১০ জন ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হন।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ক্রমাগত বাড়ছে
১৯৭৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এ দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রবণতা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন সময় একটি-দুটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র কখনো কখনো ফাঁস হলেও ২০১২ সালের পর থেকে পরীক্ষা হলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে বা অভিযোগ উঠছে।
২০১২ সালের পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ বছরেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অন্তত ৮০টি বিষয়ের (পত্রের) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। শুরুর দিকে বিষয়টি গুজব বা সাজেশন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালে সরকারি তদন্তেই প্রমাণিত হয়, ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি ও গণিতের প্রশ্নপত্র হুবহু ফাঁস হয়। ২০১৩ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রায় সব প্রশ্ন ফাঁস হলেও সরকারি তদন্তে বলা হয়, ইংরেজি বিষয়ে ৮০ এবং বাংলা বিষয়ে ৫৩ শতাংশ প্রশ্ন ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায়।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার গণিত বিষয়ের প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগেই ফাঁস হলেও পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি। সর্বশেষ গত মাসে অনুষ্ঠিত জেএসসি এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এখন আর বিষয়টিকে আমলেই নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ড।
বোর্ডের পরীক্ষার বাইরে ১৫ বছর ধরে বিসিএস থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অর্ধশতবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। গত ১৯ মে অগ্রণী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল করা হয়। গত অক্টোবরে সরকারি কর্ম কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত জ্যেষ্ঠ নার্স নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়। এ কারণে পরীক্ষাটি বাতিল করা হয়। গত মঙ্গলবার বরগুনা ও মুন্সিগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে ওই দুই জেলার ৩৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে কোচিং-বাণিজ্যের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষার আধিক্যও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বড় কারণ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, কোচিং চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা বাদ দিতে হবে। কারণ এই দুটি পরীক্ষা শিশুকে আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে না, তাদের পরিবারগুলোকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY