দোতলায় উঠে দ্রুত একেকটা ঘর পার হয়ে তিনতলার স্মারকগুলো দেখে ওরা নেমে আসতে পারত। ১৫ মিনিটেই পুরো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে বলতে পারত, ‘দারুণ!’ তারপর মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য শোনাতে পারত উপাদেয় কিছু সংলাপ। সে রকম কিছুর বিন্দুমাত্র আশঙ্কা থাকলে ওদের ডেকে এনে কোনো একটি স্মৃতিচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে বলা যেত বুকারজয়ী লেখক বেন ওকরির কথা।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বন্ধুদের কেউ যদি এক মিনিটের জন্য প্রদর্শনীর একটি ছবি দেখে আরেকটি ছবির দিকে চলে যায়, তাহলে আমি আবার তাঁকে ছবিটার কাছে টেনে আনি। বলি, দুইটা মিনিট দাঁড়াও। চোখ মেলে দেখো। ছবিটাই তোমার সঙ্গে কথা বলবে। ততক্ষণ সময় দাও।’
কিন্তু সে পথে হাঁটতে হলো না। ওরা চারজন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্মারকের দিকে তাকিয়ে থাকল নির্নিমেষ। চলমান ভিডিওর সামনে বসল কিছুক্ষণ। চার জাতীয় নেতার পরিধেয় বস্ত্রের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে উঠল একজন, ‘আরও একজন ছিল সরকারে, সেই তো হত্যা করিয়েছে জাতীয় চার নেতাকে!’ মুক্তিযোদ্ধাদের হাইডআউট থেকে উদ্দীপিত হওয়ার পরপরই কবি মেহেরুন্নেসার কবিতা দেখে এবং তাঁকে কীভাবে হত্যা করেছে, তা জানতে পেরে ওদের দীপ্ত চোখের চাহনি কোমল, নির্জীব হয়ে গেল। ওদের মনের পরতে পরতে যেন ছড়িয়ে যেতে থাকল এক অজানা অথচ চিরচেনা রহস্যময় ইতিহাস।
ছোট্ট রেহানার ছোট্ট জামাটা ওদের মূক করে দিল। একটি চার মাস বয়সী শিশুর বাবাকে বাড়িতে না পেয়ে তাঁর সন্তানকে বুট দিয়ে পিষে মেরেছিল পাকিস্তানিরা—এ যেন ওদের বুক ভেঙে দিল। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণে উদ্দীপিত হয়ে ওরা ওই ঘরেরই অন্য স্মারকগুলো দেখে যখন প্রবেশ করল কালরাত্রির ভয়ংকর সেই ঘরে, তখন ওরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠছিল অন্য মানুষ। বেশ তো অভিনয় করে, নেচে-গেয়ে চলে যাচ্ছিল জীবন, হঠাৎ একাত্তর এসে যেন নিমেষেই পাল্টে দিল ওদের ভাবনার জায়গাটা।
নাটকের সাবিলা নূর, ইরফান সাজ্জাদ, নাচের পূজা সেনগুপ্ত আর গানের সভ্যতা যখন এসেছিল এখানে, তখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। ক্যানটিনে খিচুড়ি, মুরগি আর ডিমের কথা বলে আমরা জাদুঘরের গ্যালারির দিকে এগিয়েছিলাম। এ যুগের ছেলেমেয়ে, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো ওদের মনে কি সত্যিই রেখাপাত করবে—এ প্রশ্ন ছিল মনে। কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টার এই যুদ্ধভ্রমণ সত্যিই জন্ম দিল একধরনের পূর্ণতার।
যুদ্ধ নিয়ে কথাবার্তা
ওরা যখন নেমে এল নিচে, তখন শুরুর চপলতার লেশমাত্র ছিল না। সাবিলা আর সাজ্জাদ এই প্রথম এসেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সাজ্জাদের আফসোস, কেন আগে আসেনি এখানে! সাবিলার মন থেকে রেহানা আর নারী নির্যাতনের বিভীষিকা যেন সরছিলই না। সভ্যতা ভাবছিল, পাকিস্তানের ব্যাংক হয়ে কী করে তারা পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে কথা নিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপছিল আর পূজা তখনই ভেবে নিয়েছে, সুযোগ পেলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই তৈরি করে ফেলবে নাচের এক কোরিওগ্রাফি। পূজা কথা বলতে গিয়ে বলছিল, ‘বারবার আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা উচিত। এখানে এলে বুঝতে পারি একাত্তরে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তা শুকিয়ে যাওয়ার নয়। এই কষ্ট, দুঃখ যেন আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। যারা ছোট, তাদেরও নিয়ে আসা উচিত।’
সভ্যতা বলল, ‘যেভাবে গ্যালারি সাজানো, তাতে মুগ্ধ হয়েছি। দোতলার গ্যালারিতে ইস্ট পাকিস্তান, সেটাই আস্তে আস্তে তিনতলার গ্যালারিতে হয়ে গেল ইস্ট বেঙ্গল। এরপর তো বাংলাদেশ। আমি এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার আগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছিলাম। সে পরীক্ষায় বাংলা দ্বিতীয় পত্রে ছিল রচনা। ক্লাসে আমি একা লিখেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচনাটি। কোনো বই পড়ে নয়, জাদুঘর দেখে যে অনুভূতি হয়েছিল, তা-ই লিখেছিলাম। বাংলা স্যার প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে সে রচনার প্রশংসা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার মা ছোট ছিলেন। পাকিস্তানি মিলিটারি বাড়িতে এলে তারা কাঠের দোতলায় লুকিয়ে ছিলেন। সেটাই মনে আছে মায়ের। মা এখন বলেন, “তখন বুঝিনি, কী বিশাল হত্যাযজ্ঞ চলেছিল দেশজুড়ে। এই বয়সে এসে তা বুঝতে পারি।”’
সাজ্জাদের ঘোর কাটেনি তখনো। ও মৃদুস্বরে বলল, ‘আমি যেন একাত্তরে ভ্রমণ করে এলাম। একাত্তরের শুরু থেকে শেষ। পুরোটা ঘুরে আসার পর যে অনুভূতি আমার, তা বেদনাময়। আমরা তো সৌভাগ্যবান, যে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে সেই সময়ের মানুষদের, আমি কি তা সহ্য করতে পারতাম? একটা কষ্টের অনুভূতি নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।’ তারপর হঠাৎই প্রসঙ্গ পাল্টে ও বলে উঠল, ‘আচ্ছা, এখন যেমন আছি, তেমন দেশই কি চেয়েছিলেন আত্মত্যাগী মানুষেরা? তারা তো নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে গেলেন। তখন তো সবাই বাঙালি। এখন কেন আবার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান প্রসঙ্গ আসছে? কেন এখন সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ আসছে? আমাদের মূল্যবোধটা কি নড়ে গেছে?’ সাজ্জাদের কথা শেষ হতে চায় না। সে বলে চলে, ‘এখন দেখি, মরে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়া হয়। বেঁচে থাকতে কি সম্মান দেওয়া যায় না?’
সাবিলা কথা বলল ধীরেসুস্থে। ওর চোখে তখনো ভাসছিল সদ্য ঘুরে আসা গ্যালারির স্মারকগুলো। ও বলল, ‘নয় মাসের যুদ্ধ যেন দুই ঘণ্টায় দেখলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছে এ এক চলচ্চিত্রযাত্রা। আমার চোখের সামনে যেন ঘটে যাচ্ছে নানা ঘটনা। আমি সে দৃশ্যগুলোর মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলেছি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আমার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এখানে এমন অনেক কিছুই আছে, যা বই পড়ে জানা যাবে না। যুদ্ধে কত যে নায়ক আছেন, তা অনুভব করতে হলে এই জাদুঘরে আসতে হবে। এই যে যেমন রেজাউল হক নামের একটি ছেলে, ক্লাস এইটে পড়ছিল, সে যুদ্ধ করেছে। এই বয়সেই অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এটা আমি এখানে এসে অনুভব করেছি। নারী নির্যাতনের ছবি দেখে আমি বিহ্বল হয়ে গেছি।’
অনুপ্রেরণা নিয়ে
এই যে দেখা হলো এই জাদুঘর। যে অনুপ্রেরণা পাওয়া গেল, তা থেকে সৃজনশীল কিছু কি বেরিয়ে আসবে না? নতুন কোনো ইচ্ছা কি জাগবে না? পূজা মোহিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে। স্কুলজীবনে তো পড়ানো হয়েছিল অন্য ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়নি ইতিহাসে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছে পূজা। ও বলল, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের তো ভালো সিনেমা খুব বেশি হয়নি। নাচ তো একেবারেই হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই একটা কোরিওগ্রাফি করতে চাই। একজন বাঁশি বাজাল আর সবাই তার পেছন পেছন চলল—এই যে একাত্মতা, সেটাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করব।’
সাজ্জাদ বলল, ‘যেকোনো মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করতে চাই। বঙ্গবন্ধুর চরিত্র পেলে তো নিজেকে সার্থক মনে করব। একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করার লোভও আমার আছে।’
গান নিয়ে নতুন কী আর করার আছে, যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান এখনো গায়ের রোম খাড়া করে দেয়? সভ্যতা সে কথাই বলল। ‘আমরা যা করতে পারি, ওই গানগুলো অনুভবে আনতে পারি। আর ওই গান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন গানের অপেক্ষায় কাটাতে পারি জীবন।’
আবার রেহানা
‘তোমাদের চারজনকে একটাই প্রশ্ন করব।’
অপেক্ষায় থাকি, দেখি ওদের অবয়ব। আগে থেকে ওরা বুঝতে পারেনি কী নিয়ে কথা হবে এখন।
বলি, ‘আচ্ছা, তুমি যদি রেহানার মা বা বাবা হতে, তোমার চোখের সামনে বুটে পিষে ফেলছে তোমার সন্তানকে। তখন কেমন হতে পারত তোমার অনুভূতি?’
এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। ওদের গালে সজোরে কেউ যেন চড় মেরেছে। একেবারে স্তম্ভিত হয়ে কিছুক্ষণ নিথর ওরা। তারপর একে একে ধাতস্থ হয়।
সভ্যতা বলল, ‘আমার বাবা তিন বছর আগে মারা গেছেন। স্বাভাবিক মৃত্যু। আমি এখনো সে ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আপনি যে প্রসঙ্গ আনলেন, তাতে আমার কেমন লাগত, তা আমার ভাবনার অতীত।’
পূজা বলল, ‘অনুমান করে আসলে এ ব্যাপারে কিছু বলা যায় না। এই বাচ্চা যদি আমার বাচ্চা হয়, তাহলে আমি অবশ্যই আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এই হত্যার বিচার চাইব।’
সাজ্জাদেরও মন ছুঁয়েছে রেহানা। ‘আমি রেহানার কারণেই কোনো দিন পাকিস্তানকে ক্ষমা করব না। আমার অস্তিত্বের কোনো জায়গায় পাকিস্তানের কোনো স্থান নেই।’
‘আমি কখনো ওই মা হতে চাই না। আমার চিন্তায়ও আসে না, ও রকম কোনো ঘটনা ঘটার কথা ভাবতেই পারি না।…’ বলল সাবিলা।
আমরা একাত্তরের ঘোর থেকে বের হতে পারি না অনেকক্ষণ।














