রুবেলের যন্ত্রণা বেড়ে দ্বিগুণ!

865

শুয়োপোকা থেকেই প্রজাপতি হয়। বাগেরহাটের খোলস অবশ্যই রুবেল হোসেন এখনো পুরোপুরি ছেড়ে আসতে পারেননি। নোনা জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠার রুক্ষতা এখনো তাঁর মধ্যে আছে। তা ফাস্ট বোলারদের একটু-আধটু ব্যাড বয় হওয়াও নাকি ভালো। চিরকালই কি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কেবল প্রতিপক্ষ ফাস্ট বোলারকে বলবে, তোমার চোখ এত লাল কেন!

মাশরাফি বিন মুর্তজা নামের অবিশ্বাস্য প্রতিভাধর তরুণ ফাস্ট বোলারটা যখন চোটের সঙ্গে লড়াই করে পেসার হয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সময়ই একটা রুক্ষতা নিয়ে আবির্ভাব তাঁর। বোলিং অ্যাকশন প্রথাগত নয়। ১৪০-এর গতি। প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের নামটা বিরাট কোহলি হলেও তাঁর দিকেও রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাতে ভয় পান না। আড়াআড়ি ডেলিভারি করেন। কেউ কেউ তো তাঁকে বাংলাদেশের মালিঙ্গা বলতেও শুরু করেছিলেন।

২০১৫ বিশ্বকাপে কোহলিকে আউট করে তাঁর সেই উদ্‌যাপন তো বিখ্যাতই হয়ে গেছে। যে বিশ্বকাপের আগে আগে জেল খাটার অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক স্পেল দিয়ে তো রীতিমতো পুরো ক্রিকেট বিশ্বেই আলোচনায় । তবে রুবেল নাকি এর চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিলে কোহলির উইকেট পেয়ে। ২০১২ এশিয়া কাপে রুবেলকে কুৎসিত গালি দিয়েছিলেন কোহলি। তখন থেকেই দুজনের চলছে। ’১৫ বিশ্বকাপে জ্বালা জুড়িয়েছিল তাঁর।

গতকালও রুবেলের জ্বালা জুড়ানোর তাগিদ ছিল নিশ্চয়ই। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নানাভাবে এমন কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে, রুবেল হয়তো জীবনেও ভুলবেন না। ২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেক। সেবার মাত্র ৫.৪ ওভার বল করে ৪ উইকেট নিয়ে লঙ্কানদের গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন ১৪৭ রানে। কী উজ্জ্বল অভিষেক!

সেই রুবেল পরের ম্যাচেই খলনায়ক হয়ে গেলেন। ফাইনালে ১৫২ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশ মাত্র ৬ রানে শ্রীলঙ্কার ৫ উইকেট ফেলে দিয়েছিল। ৫১ রানে ষষ্ঠ উইকেট পড়ার পর সবাই প্রহর গুনছিল টুর্নামেন্টের ট্রফি জেতার। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির পর ১৯৯৮ সালে এসিসি ট্রফি, এরপর দুইয়ের বেশি দল খেলেছে—এমন প্রতিযোগিতায় কখনো চ্যাম্পিয়ন হতে পারে বাংলাদেশ।

সেই আক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে রুবেলও। ২০০৯-এর সেই ফাইনালে অনভিজ্ঞ রুবেলের ওপর চড়াও হয়ে ৪৭তম ওভারে ২০ রান তুলেছিলেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। ১৮ বলে ১৩ রান লাগে শ্রীলঙ্কার, বাংলাদেশের ২ উইকেট এমন সমীকরণে তবু ফিরতি ওভারে রুবেলের হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন তখনকার অধিনায়ক আশরাফুল। ৪৮তম ওভারটাতেই খেলা শেষ করে দেন মুরালি, শেষ দুই বলে চার-ছক্কা মেরে।

রুবেলের হয়তো এখন বেশি করে মনে পড়ছে ২০০৯ সালের সেই ফাইনাল। আরেকটি ত্রিদেশীয় ফাইনালের আরেক লো স্কোরিং ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল সেই শ্রীলঙ্কাই। তাতে নিজে দারুণ বলে প্রায় ৮ বছর আগের দুঃস্মৃতি ভুলিয়ে দিতে বসেছিলেন। দল জিতলে ম্যান অব দ্য ফাইনালের অন্যতম দাবিদার হতে পারতেন মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে। কিন্তু রুবেলের কষ্টের ক্ষতটা আরও রক্তাক্তই হলো।

অথচ ব্যাটসম্যানদের জন্য কী দারুণ মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন। পুরাতন বলের বোলার বলে এমনিতেই আক্রমণে আসেন দেরিতে। গতকাল বোলিংয়ে এসেছেন ২৭তম ওভারে। শ্রীলঙ্কা তখন ভালোমতোই বড় সংগ্রহের দিকে। ৩ উইকেটে ১২১ রান। হাতে ৭ উইকেট নিয়ে শেষ ২৩ ওভারের দিকে যাত্রা করা শ্রীলঙ্কা আর যোগ করতে পেরেছে ঠিক ১০০। তাতে রুবেলের কৃতিত্ব বেশি।

৩ ওভারের প্রথম স্পেলে ১২ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকলেন। আসল খেল দেখালেন দ্বিতীয় স্পেলে। ৫ ওভারে ১৬ রান দিয়ে ২ উইকেট। তৃতীয় ও শেষ স্পেলে নিলেন আরও ২ উইকেট।

সব মিলিয়ে ৪৬ রানে ৪ উইকেট, অভিষেকের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাঁর সেরা বোলিং। রুবেলের হয়তো আরও বেশি করে মনে পড়বে ‘২০০৯’। কিন্তু তা যন্ত্রণার কারণেই!

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY