১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে শ্রীদেবী যখন হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে পা রেখেই তোলপাড় তুলতে শুরু করেন, ঠিক তার আগে আগে জাপানি ও কোরিয়ান কয়েকটি কোম্পানি শুরু করে ভিসিআর (ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার) নামের এক বিশেষ যন্ত্রের স্বল্প মূল্যে গণ-উৎপাদন। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে তখন এই যন্ত্রটি প্রবেশ করতে শুরু করে আর এটির কল্যাণে বলিউডের নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো নগদানগদ দেখার সুযোগ পেতে শুরু করেন বাংলার আপামর দর্শকসাধারণ। পাড়া-মহল্লায় তখন ভিডিও ক্লাব নামক একধরনের দোকান গড়ে উঠছিল। এসব দোকান থেকে ভিডিও ক্যাসেট ভাড়ায় পাওয়া যেত।
তখনো বসার ঘরের সাদাকালো টেলিভিশন সেটগুলোকে সরিয়ে রঙিন টিভি সেট পুরোপুরি জায়গা দখল করেনি। শুরুর দিকে ভিসিআর যন্ত্রগুলো ছিল দুর্বল প্রকৃতির। বহুবার কপি হওয়া ভিএইচএস ক্যাসেটগুলো ছবি ও শব্দের মানও খুব একটা ভালো ছিল না। টিভির পর্দায় যে ছবি ভেসে উঠত, সেগুলোয় জলরঙের মতো ল্যাপটানো ছোপ ছোপ রং দেখতে পাওয়া যেত। ম্যাগনেটিক টেপের কোনো কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মাঝেমধ্যেই ছবিগুলো বেঁকেচুরে যেত।
তবু ওই কাঁপা কাঁপা ছবি আর অস্বচ্ছ ধ্বনিময় জগতের মধ্যে ভেসে উঠত শ্রীদেবীর মায়াবী ডাগর চোখ, সুডৌল মুখমণ্ডল। শিফন শাড়ি আর লম্বা বেণিতে সদ্য কৈশোর পেরোনো অস্থিরমতি এই নারী তখনই পার্থিব সৌন্দর্যের প্রতিভূ হয়ে ওঠেন। তাতে চলচ্চিত্র ডিস্ট্রিবিউশনের এই সমান্তরাল ঘরোয়া প্রযুক্তির আগমনের ভূমিকা কিছুটা যে ছিল, না মেনে উপায় নেই। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ ছিল না। শ্রীদেবীর বলিউডি সিনেমাজগতের প্রথম মেগাস্টার হয়ে ওঠা প্রায় অবশ্যম্ভাবীই ছিল। হিন্দি চলচ্চিত্র জগৎ তার জন্যই যেন আসন পেতে রেখেছিল।
হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে শ্রীদেবীর যখন উত্থান ঘটছে, তার আগে আগে হেমা মালিনীর প্রতাপ অস্ত গিয়েছে। রেখার সূর্যও দিকচক্রবালে। মাধুরী দীক্ষিতের প্রভাব বলয় শুরু হতে তখনো আরও কিছুকাল বাকি। তার চেয়ে বড় কথা, আশির দশকের শুরু থেকেই হিন্দি চলচ্চিত্র জগৎ নতুন দিকে মোড় ফিরতে শুরু করেছে। সংগীত পরিচালনায় আর ডি বর্মণের মেলোডির জায়গা দখল করতে শুরু করেছে বাপ্পী লাহিড়ীর সিনথেসাইজড ডিসকো বিট। সিনেমার কাহিনির ধরনও পাল্টে যাচ্ছিল। উঠতি লগ্নিকারকেরা সিনেমার জগৎটাকে নতুন খাতের দিকে টানছিলেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রের এই যুগটাকে অনেকে সৃজনশীলতার ঘাটতির সময় হিসেবে দেখেন। আসলেই এই সময় দাগ কাটার মতো ছবি খুব কমই তৈরি হয়েছে। নিষ্প্রভ এই সময়কালে পর্দার প্রাণময়তা ধরে রেখেছিলেন শ্রীদেবী ও অমিতাভ বচ্চন। অমিতাভ তখন পরিণত অভিনেতা। সেদিক থেকে শ্রীদেবী একটা নতুন হাওয়ার ঝাপটা হয়ে এসেছিলেন। কেবলই নৃত্যকলায় পারদর্শী এক গ্ল্যামার গার্লের ইমেজের মধ্যে সীমিত ছিলেন না তিনি। বিচিত্র ধরনের চরিত্রে ছিলেন সাবলীল। ১৯৮৩ সালের সাদমার স্মৃতি হারানো আলাভোলা দুষ্টু তরুণীর সঙ্গে পরের বছরের তোফা ছবির ললিতাকে মেলানো কঠিন। নাগিনা, চালবাজ আর লামহেতেও যেন তিনটি আলাদা শ্রীদেবী হাজির হন।
প্রায় এক দশকজুড়ে হিন্দি সিমেনার পর্দায় সৌন্দর্যের সমার্থক ছিলেন শ্রীদেবী। আর কোনো নায়িকাকে এত দীর্ঘসময়জুড়ে প্রভাব বলয় অক্ষুণ্ন রাখতে দেখা যায়নি।
দীর্ঘ বিরতির পর শ্রীদেবীর অভিনয়জীবনের দ্বিতীয় পর্ব কেবল শুরু হয়েছিল। তাঁর অকালবিদায় অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ারের একটি নারী সমান্তরাল প্রত্যক্ষ করা থেকে উপমহাদেশের সিনেমা দর্শকদের বঞ্চিত করল।













