পাঁচ মাসের আগের কথা। একটি লাল কার্ডকে কেন্দ্র করে রাগে ফুঁসছিলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় দলের উপদেষ্টা কোচ অ্যান্ড্রু ওর্ড। থিম্পুর চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামের গ্যালারির চেয়ারে লাথি মেরে রাগ মেটানোর বৃথা চেষ্টাও করেছিলেন এই অস্ট্রেলিয়ান। কিন্তু পারলেন না। দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে? সামনে থাকা এই প্রতিবেদককে উচ্চ স্বরে বললেন, ‘দেশে (ঘরোয়া ফুটবলে) ছাড় পেতে পেতে তোমাদের আজ এই অবস্থা।’ কী এমন ঘটেছিল সেদিন?
ভুটানে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ ফুটবলে টানা দুই ম্যাচ জিতে শিরোপার সুবাস পাচ্ছিল বাংলাদেশের যুবারা। নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে জিতে গেলে শিরোপা প্রায় নিশ্চিত, ড্র হলেও থাকবে শিরোপার হাতছানি। ১-১ গোলে সমতায় চলা ম্যাচটির দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের দুর্দান্ত প্রতাপে কোণঠাসা হয়ে আছে নেপালিরা। এমন সময় এক খামখেয়ালি কাণ্ড করে বসলেন বাংলাদেশের রাইটব্যাক বিশ্বনাথ ঘোষ। একেবারেই অহেতুক নেপালি এক খেলোয়াড়কে কনুই মারেন তিনি। শাস্তিস্বরূপ সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় বিশ্বনাথকে।
এই লাল কার্ডের মাশুল দিতে হয়েছিল বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে হেরে। তাই বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ ও যুব দলের উপদেষ্টা কোচের রেগে ফেটে পড়ার কারণ ছিল যথার্থই। ওর্ডের যুক্তি ছিল, ‘গোল ঠেকিয়ে লাল কার্ড দেখলে আমি ওকে বাহবা দিতাম। কিন্তু অহেতুক কনুই মেরে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়াটা দেশদ্রোহীর মতো কাজ। এর পেছনে ঘরোয়া ফুটবলের রেফারিংই দায়ী। বাংলাদেশে এমন হলে রেড কার্ড দেখায় না।’
তিন দিন আগে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে আরও একটি লাল কার্ড দেখতে হলো। নিউ রেডিয়ান্টের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচের ৬৫ মিনিটে অহেতুক একটি ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন আবাহনীর নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার সানডে চিজোবা। রেডিয়ান্টের যে ডিফেন্ডার হিসাম সালেমকে তেড়ে এসে ফাউল করেছেন সানডে, তাঁর (হিসাম) অবস্থান ছিল নিজেদের অর্ধের মধ্যেই। অর্থাৎ ফুটবল ট্যাকটিকসের দৃষ্টিতে হিসামের পায়ের বল আবাহনীর জন্য কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিল না।
হয়তো অভ্যাসের বসেই ফাউলটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন সানডে! কেননা ঘরোয়া ফুটবলে এমন ট্যাকল করলে কার্ড তো দূরের কথা, অনেকাংশে ফাউলের বাঁশিই বাজাতে চান না রেফারিরা। মাঠে কিছু হলেই রেফারির দিকে তেড়ে যাওয়ার উদাহরণ আছে অহরহ। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে লাল কার্ড দেখালে কার দিকে তেড়ে যাবেন আবাহনী কর্তারা!
ঘরোয়া ফুটবলে এমন ফাউলে লাল কার্ড দেখানো হলে কী হতো? এই প্রশ্নের উত্তর তো নাম প্রকাশ করে কেউ দিতেই চাইলেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বললেন, ‘আমরা এমন লাল কার্ড দিলে খেলা সাময়িক বন্ধ হয়ে যেত। আমাদেরও খবর হয়ে যেত। হা হা!’ হাসির মধ্যেও অস্বস্তি আর দুঃখটা লুকাতে পারছিলেন না বাংলাদেশি রেফারি।
এএফসি কাপে আবাহনীর জন্য লাল কার্ড নতুন কিছু নয়। গত বছর বেঙ্গালুরু এফসির বিপক্ষে বলে হাত লাগিয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন আবাহনীর ডিফেন্ডার নাসিরউদ্দিন চৌধুরী। যদিও ১০ খেলোয়াড় নিয়ে খেলে সে ম্যাচে ভারতের চ্যাম্পিয়ন দলকে ২-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নরা। লাল কার্ড ফুটবলেরই অংশ। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও অহরহ দেখা যায় লাল কার্ড। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘরোয়া ফুটবলে একই রকম ফাউল করে কীভাবে পার পেয়ে যান ফুটবলাররা?
প্রশ্নের উত্তরটা একটু ঘুড়িয়ে বলেছেন সদ্য অবসর নেওয়া বাংলাদেশের অন্যতম সেরা রেফারি আজাদ রহমান, ‘সত্যি কথা বলতে ঘরোয়াতে রেফারিং করাটা একটু কঠিনই। যদিও আমি কোনো চাপ অনুভব করতাম না। তবে চার-পাঁচটা দল আছে, যাদের বিপক্ষে লাল কার্ড অথবা গোল বাতিল করা মানেই ফেডারেশনে অভিযোগ তোলা। এই রেফারিকে যেন আর তাদের ম্যাচে দেওয়া না হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে তো আর ছাড় পাওয়া যায় না।’
ঘরোয়াতে রেফারিদের চাপে রেখে নিজেদের যে কতটা সর্বনাশ করছে বাংলাদেশের ক্লাবগুলো, সেটা কী বোঝেন তারা?













