পুরোদেশ প্রতিবেদন
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে একজন প্রকৃত গেরিলা বলে উল্লেখ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বঙ্গমাতার ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, সে সময় বেগম মুজিব পুলিশ ও গোয়েন্দা চক্ষুর আড়ালে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন। বিচক্ষণতার সঙ্গে ছাত্রদের তিনি নির্দেশনা দিতেন এবং অর্থ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন। এমনকি নিজের গহনা বিক্রি করেও অর্থ জুগিয়েছেন।
কারান্তরীণ বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বঙ্গমাতা নেপথ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নজর এড়িয়েই। প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ৪৭ টি ফাইল পাওয়া গেছে।সেগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি ১৪ খন্ডের প্রকাশনা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ৪৭টি ফাইল পাওয়া গেলেও বেগম মুজিবের গোপন তৎপরতা নিয়ে কোথাও কোন রিপোর্ট নেই। এ তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেগম মুজিব প্রকৃতই একজন গেরিলা ছিলেন।
শেখ হাসিনা বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গমাতার অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, জাতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বঙ্গমাতার পরামর্শ জাতির পিতাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছে।জাতির পিতার জন্য প্রেরণা, শক্তি এবং সাহসের এক উৎস ছিলেন বঙ্গমাতা। স্বামীর সকল সিদ্ধান্তে মনস্তাত্ত্বিক সহযোগিতা ছাড়াও বঙ্গমাতার পরামর্শ অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মা ও জাতির পিতার সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাত্রিতে বঙ্গবন্ধু এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গমাতা সম্পর্কে বলেন, তাঁর সম্পর্কে মানুষ খুব সামান্যই জানে। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও প্রচার বিমুখ ছিলেন। তাই বঙ্গমাতার অবদান লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বেগম মুজিব খুব অল্প বয়সে মা-বাবাকে হারান। আমার দাদা-দাদীর কাছে বেড়ে ওঠার সময় অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে সাহস, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা গড়ে উঠেছিল।
বঙ্গমাতাকে প্রধানমন্ত্রী- স্বামী-সংসার অন্তঃপ্রাণ বাঙালি নারী এবং শোষিত-নিপীড়িত জনসাধারণকে মুক্তির চেতনায় জাগিয়ে তোলার সংগ্রামে স্বামীর পাশে থাকা সহযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলখানায় দেখা করতে গেলে আব্বা তাঁর মাধ্যমেই দলীয় নেতা-কর্মীদের খোঁজ-খবর পেতেন। আব্বার দিক-নির্দেশনা আম্মা নেতা-কর্মীদের পৌঁছে দিতেন। আব্বা কারাবন্দী থাকলে সংসারের পাশাপাশি সংগঠন চালানোর অর্থও আমার মা যোগাড় করতেন।
বাবার কোন কাজেই মা প্রতিবন্ধক নয় বরং সহায়ক ছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মা চাইলে স্বামীকে সংসারের চার দেয়ালে আবদ্ধ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনও ব্যক্তিগত-পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে তাকাননি।
বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করে এ সময় আক্ষেপের সুরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাবাকে কখনও টানা দু’বছরও আমাদের মাঝে পাইনি।’
তাঁর মা এবং বঙ্গবন্ধু মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একে অপরের পরিপূরক ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জীবনের একটি বড় সময়ই কারাগারে কাটিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর অবর্তমানে একদিকে যেমন সংসারের দায়িত্ব পালন অন্যদিকে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনাসহ প্রতিটি কাজে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।’
১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন শুরুর পর দেশ মাতৃকার প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে জাতির পিতার সহযোদ্ধা বেগম মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতারও কিছু উপাখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বেগম মুজিবের একটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ’৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায় পাক সামরিক সরকার। ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কোন হদিস ছিলনা, আমরা জানতেও পারিনি তিনি বেঁচে আছেন কি না। এরপরে কোর্টেই বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখার সুযোগ হয়। তখন পাকিস্তান সরকার আম্মাকে ভয় দেখান, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না নিলে তিনি বিধবা হবেন।’
প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি রোমন্থনে বলেন, ‘আম্মা সোজা বলে দিলেন, কোন প্যারোলে মুক্তি হবে না। নি:শর্ত মুক্তি না দিলে কোন মুক্তি হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমি মায়ের সিদ্ধান্তের কথা কোর্টে যখন বঙ্গবন্ধুকে জানালাম তখন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকেও দেখেছি তারা বলেছেন, তুমি কেমন মেয়ে? বাবার মুক্তি চাওনা? আম্মাকে বলেছে-ভাবি আপনি কিন্তুু বিধবা হবেন।’
‘আমার মা তখন কঠিন স্বরেই বলেছেন, প্যারোলে মুক্তি নিলে মামলার আর ৩৩ জন আসামীর কি হবে। বঙ্গবন্ধু প্যারোলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। গণঅভ্যুত্থানে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নি:শর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এর আগে, ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করে জনমত সৃষ্টির জন্য সারাদেশে জনসভা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আট বার গ্রেফতার হন। তখন কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতার ৬-দফাকে ৮-দফায় রূপান্তরের চেষ্টা বেগম মুজিবের জন্য ভেস্তে যায়। তিনি বলেন, ৬ দফা আন্দোলনের সময় সব থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য ৭ জুনের হরতাল সফল করা, সেটাও সফল হয়েছিল বেগম মুজিবের প্রচেষ্টায়। তিনি নিজ বাসা থেকে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে সেখান থেকে স্যান্ডেল আর বোরখা পরে জনসংযোগে বেরিয়ে পড়তেন।
ইউনেস্কো কতৃর্ক ওয়ার্র্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেই দিন নানা জনে নানা পরামর্শ দিচ্ছে। আম্মা তখন তাঁকে একটি ঘরে বিশ্রামের সুযোগ করে দিয়ে মোড়া টেনে মাথার কাছে বসে বঙ্গবন্ধুকে কিছুক্ষণ চোখটা বন্ধ করে রাখতে বললেন।
তারপর আম্মা বললেন, ‘তোমার যা মনে আসে তাই তুমি বলবে। তুমি রাজনীতি করেছো, কষ্ট সহ্য করেছ, তুমি জান কি বলতে হবে। কারও কথা শোনার দরকার নাই।’
তিনি সেদিন এ ভাষণের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘এই লাখো জনতা যেন হতাশ হয়ে না যায়। আবার পাকিস্তানীরা যেন গোলাগুলি করে এদের শেষ করে দিতে না পারে।’
বঙ্গবন্ধুকে বেগম মুজিব যখন এই পরামর্শ দেন তখন সেই ঘরে শেখ হাসিনাই কেবল সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা জানান।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আম্মার যে মনোবল দেখেছি, তা ছিল কল্পনাতীত। স্বামীকে পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে গেছে। দুই ছেলে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তিন সন্তানসহ তিনি গৃহবন্দী। যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আম্মা মনোবল হারাননি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার ‘মা’ নিজের জন্য কখনও কিছু চাননি। অথচ সারাজীবন এই দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তিনি এ দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আব্বার সঙ্গে থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন- এদেশের মানুষ ভালো থাকবে, সুখে-শান্তিতে বাস করবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবার পাশে থেকে সে স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছেন।’
তাঁর মায়ের আত্মত্যাগ বাবাকে এগিয়ে নিয়েছে বলেই বঙ্গবন্ধু জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছেন। কাজেই এ স্বাধীনতায় তাঁর মায়ের অবদান অবিস্মরণীয়’- বলেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার কন্যা শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাবা-মায়ের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভাল ছিল। বাবাকে কোন পরামর্শ দিতে হলে আমিই চলে যেতাম মা’র মিশন নিয়ে। বাবা ভিড়ের মধ্যেও আমাকে একবার দেখলেই বুঝতে পারতেন ‘জরুরী কোন ম্যাসেজ আছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গমাতাই বোধ হয় সবচেয়ে আগে জানতেন, এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে।’
মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমেন এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মমতাজ বেগম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতার জীবন ও কর্মের ওপর একটি ভিডিও প্রামান্য চিত্র প্রদর্শিত হয়।
(ডেস্ক/এমএইচকে)
সংবাদসূত্র: বাসস
সংবাদচিত্র: ইয়াসিন কবির জয়/ফোকাস বাংলা নিউজ
অনুষ্ঠানের আরো সংবাদচিত্র দেখুন: https://www.facebook.com/yeasin.k.joy/posts/10155757714529537













