রসায়নে নোবেল জয় তিন বিজ্ঞানীর

695

রসায়নে নোবেলজয়ী (বাম থেকে) সুইজারল্যান্ডের জ্যাকস ডুবোশেট, আমেরিকার জোয়াকিম ফ্রাংক ও যুক্তরাজ্যের রিচার্ড হ্যান্ডারসন। ছবি: রয়টার্স
বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক অণুর প্রতিচ্ছবি ধারণের কৌশল আবিষ্কার করে এ বছর রসায়নে নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন সুইজারল্যান্ডের জ্যাকস ডুবোশেট, যুক্তরাষ্ট্রের জোয়াকিম ফ্রাংক ও যুক্তরাজ্যের রিচার্ড হ্যান্ডারসন।

আজ বুধবার নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের নাম ঘোষণা করে। ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি নামের একটি কৌশল আবিষ্কার করেন তাঁরা, যার মাধ্যমে জৈবিক অণুগুলোকে হিমায়িত করে এর প্রতিচ্ছবি নেওয়া সম্ভব।

আগে বিভিন্ন জৈবিক অণুর প্রতিচ্ছবি ধারণে রঞ্জক পদার্থ ব্যবহারসহ জটিল কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। কিন্তু এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অণুগুলোর প্রকৃত আকার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে জানা যেত না। ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখন এর মাধ্যমে আগের চেয়ে সহজ পন্থায় জৈবিক অণুর প্রায় পূর্ণাঙ্গ রূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

আজ সুইডেনের স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রসায়নে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী তিনজনের নাম ঘোষণা করা হয়। এতে তিন বিজ্ঞানী জ্যাকস ডুবোশেট, জোয়াকিম ফ্রাংক ও রিচার্ড হ্যান্ডারসনের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন নোবেল কমিটি ফর কেমিস্ট্রির সদস্য পিটার ব্রেজজিনস্কি। এ সময় কমিটির চেয়ারম্যান সারা স্নোগেরাপ লিনজে ও রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের মহাসচিব গোরান হ্যানসন উপস্থিত ছিলেন।

নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপির মাধ্যমে জৈবিক অণুর উন্নতমানের প্রতিচ্ছবি ধারণ আগের চেয়ে অনেক সহজে করা যাবে। এর ফলে জীবদেহের জটিল সব কলকবজা সম্পর্কে গভীরভাবে জানা সম্ভব হবে। এ পদ্ধতি প্রাণরসায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি নিয়ে আসবে।

বিজ্ঞান সব সময়ই অদৃশ্য জগৎকে দৃশ্যমান করার মধ্য দিয়ে তার পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হয়েছে। এত দিন ব্যবহার হয়ে আসা বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবদেহের আণবিক পর্যায়ের বহু কলকবজার পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া কঠিন ছিল। ফলে প্রাণরসায়নের একটি বড় ক্ষেত্র ছিল মূলত ধোঁয়াশাপূর্ণ। ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ঠিক এ জায়গাটিকেই আমূল বদলে দিয়েছে। এ কৌশল ব্যবহার করে গবেষকেরা এখন সহজেই গতিশীল যেকোনো জৈবিক অণুকে স্থবির করে দিতে পারবেন। আর নিতে পারবেন এমন সব কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি, যা এত দিন একেবারেই অদৃশ্য ছিল। এ কৌশল প্রাণ রসায়নের পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির গবেষণাকেও বহুলাংশে এগিয়ে নেবে।

নোবেল কমিটি জানায়, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপকে দীর্ঘদিন ধরেই শুধুমাত্র মৃত বস্তুর প্রতিচ্ছবি ধারণে সক্ষম একটি প্রযুক্তি হিসেবে ধারণা করা হতো। কারণ ইলেকট্রনের শক্তিশালী রশ্মি জৈবিক অণুগুলোকে ধ্বংস করে ফেলত। কিন্তু ১৯৯০ সালে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো একটি প্রোটিন অণুর ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি ধারণে সফল হন রিচার্ড হ্যান্ডারসন। আর এ সাফল্যই প্রাযুক্তিক সম্ভাব্যতাকে সামনে নিয়ে আসে। এদিকে জোয়াকিম ফ্রাংকও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসর বাড়ানোর কাজটি করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে তিনি এমন এক কৌশল উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে অস্পষ্ট দ্বিমাত্রিক একটি প্রতিচ্ছবি বিশ্লেষণ করে সুস্পষ্ট ত্রিমাত্রিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রেও তিনি ব্যবহার করেন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ প্রযুক্তি। আর জ্যাকস ডুবোশেট এ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করেন পানিকে। আগে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের শূন্যস্থানে থাকা পানির অণু সহজেই বাষ্পীভূত হতো, যা জৈবিক অণুকে ভেঙে ফেলতো। কিন্তু ১৯৮০ সালে ডুবোশেট পানিকে খুব দ্রুত ঠান্ডা করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। এ প্রক্রিয়ায় পানি তরল অবস্থাতেই জৈব অণুর চারপাশে একটি আবরণ তৈরি করে জমে যায়। ফলে জৈবিক অণুটি ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে বিশ্লেষণের সময় ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। ফলে জৈবিক অণুর স্বাভাবিক আকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়।

তিন বিজ্ঞানীর এ প্রচেষ্টাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে সময় লেগে যায় ২০১৩ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে সমন্বিত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রোটিন থেকে শুরু করে হালের জিকা ভাইরাস, সব ধরনের জৈবিক অণুর প্রতিচ্ছবি ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে, যার প্রমাণ রয়েছে গত কয়েক বছরে প্রকাশিত সব জার্নালে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY