ইজি বাইকে আনইজি জীবন

559
কিশোরগঞ্জ শহরের পুরান থানা এলাকায় গত বুধবার সকাল ১০টার চিত্র। নতুন স্থাপন করা সড়ক বিভাজকের দুই পাশ দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করছে যানবাহন। মাঝেমধ্যে কিছুটা জট লেগে গেলেও পুলিশের তৎপরতায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। যানজটে অতিষ্ঠ শহরবাসীর কাছে এ এক অচেনা দৃশ্য। এক মাস আগেও এই পুরান থানা এলাকার সড়কে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভয়াবহ যানজট লেগে থাকত। পথচারীদের হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থাটুকুও ছিল না। বিশেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজি বাইকের নৈরাজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের পর পুরোপুরি পাল্টে গেছে এ সড়কের চেহারা। তবে শহরের অন্যান্য সড়কে যানজট পরিস্থিতির কোনোই উন্নতি হয়নি। সড়কগুলোতে ইজি বাইকের দৌরাত্ম্য জনজীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। স্থানীয় লোকজন জানায়, পুরান থানা এলাকার যানজটমুক্ত সড়কের এ চিত্র পুলিশ না থাকলেই পাল্টে যায়। পুলিশের চেষ্টায় সকালের দিকে যানজট নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিকেল থেকে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্ধ্যার দিকে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। যানজট একরামপুর হয়ে গৌরাঙ্গ বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তাবন্দি থাকতে হয় লোকজনকে। শোলাকিয়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের কঠোরতার ওপর শহরের যানজটের মাত্রা ওঠানামা করে। এ যেন জোয়ার-ভাটা। ইজি বাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যানজট থেকে মুক্তি মিলবে না শহরবাসীর। ইজি বাইকে তো আনইজি হয়ে পড়েছে জীবন। ’ পুরান থানা এলাকা পার হয়ে গৌরাঙ্গ বাজার মোড়ে যেতেই দেখা গেল যানজটের সেই চিরচেনা দৃশ্য। সেখানে কথা হয় মোশারফ হোসেন নামে এক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওপারে যাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট ধরে রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে আছি। সরু রাস্তায় কয়েকটি সারি করে গাড়িগুলো যানজটে দাঁড়িয়ে আছে। ফুটপাতগুলোও বলতে গেলে ব্যবসায়ীদের দখলে। রাস্তায় পা ফেলার মতো অবস্থাও নেই। ’ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শহরের একরামপুর, সতাল, স্টেশন রোড, কাছারি মোড়, রথখলা সড়ক, বড়বাজার, জাহাঙ্গীরের মোড়, মোরগমহাল, কালীবাড়ি মোড়, বটতলা, জেনারেল হাসপাতাল এলাকা, আখড়াবাজার মোড়, তেরিপট্টি ঘুরে যানজটের ভীতিকর পরিস্থিতি চোখে পড়ে। এ সময় স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, অফিসগামী লোকজন, সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কিশোরগঞ্জ শহরে যানজটের বেশ কিছু কারণ বিভিন্ন সময় চিহ্নিত করা হলেও সেসব সমাধানে বড় কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এসবের মধ্যে অপ্রশস্ত সড়ক, অবৈধ ইজি বাইক, শহরজুড়ে অবৈধ স্ট্যান্ড, সমন্বয়হীন উন্নয়নকাজ, ফুটপাত দখল, রাস্তা দখল করে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট অন্যতম। যানজট প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ বলেন, ‘কয়েক মাস আগে ইজি বাইক নিয়ন্ত্রণসহ আরো কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলাম। এর অংশ হিসেবে ৬০০ ইজি বাইককে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছিল, যেগুলো কেবল শহরের মধ্যে চলাচল করার কথা। শহরের বাইরে অর্থাৎ বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা অটোরিকশাগুলোকে শহরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। তখন শহরের যানজট পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু সহযোগিতার অভাবে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। ’ ঠিক কতসংখ্যক ইজি বাইক শহরে চলাচল করছে সে হিসাব দিতে পারেননি কিশোরগঞ্জ বিআরটিএর মোটরযান নিয়ন্ত্রণ পরিদর্শক সাইফুল কবির। তিনি বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে এগুলো অবৈধ যানবাহন। তাই ইজি বাইকের কোনো পরিসংখ্যান আমাদের খাতায় নেই। তবে সংখ্যাটা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজারের কম হবে না। এগুলো বন্ধ করতে হাইকোর্টের নির্দেশনাও রয়েছে। আমরা সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি। ’ তিনি জানান, আগে বিদেশ থেকে ইজি বাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি করা হলেও বর্তমানে তা বন্ধ। তবে দেশেই এখন এগুলো তৈরি হচ্ছে বলে নতুন নতুন ইজি বাইক প্রতিদিন রাস্তায় নেমে যানজট সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। ছোট্ট একটি শহরে ১০ হাজার ইজি বাইক চললে যানজট কিভাবে কমবে? প্রধান সড়কগুলোতে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, বেসরকারি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ও হাসপাতাল শহরের যানজটে ভূমিকা রাখছে। একরামপুর থেকে কালীবাড়ি মোড় পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার সড়কে ১৪টি বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসবের কোনোটিতেই গাড়ি রাখার পৃথক জায়গা রাখা হয়নি। এসব রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের সামনে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। এসব কারণে শহরে যানজটের সৃষ্টি হয়। বত্রিশ এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে এলোমেলোভাবে রাখা গাড়িগুলো শহরের যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্র ও শনিবারে রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় থাকে। তখন শহরে যানজট আরো বেড়ে যায়। ’ শহরের এমন কোনো সড়ক নেই, যেখানে অবৈধভাবে ইজি বাইকের স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়নি। এসব সড়কে রাস্তা দখল করে ইজি বাইকগুলো যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে। ফলে রাস্তার অর্ধেকটাই এসব গাড়ির দখলে চলে যায়। শহরজুড়ে এ ধরনের ২০ থেকে ২৫টি স্ট্যান্ড রয়েছে। যানজট সৃষ্টিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাও কম যায় না। পুরান থানা, একরামপুর, উকিলপাড়া, হাসপাতাল, বটতলা মোড়, বত্রিশ, নগুয়া, ফায়ার সার্ভিস এলাকাসহ আরো বেশ কিছু এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে অটোরিকশার স্ট্যান্ড। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এসব স্ট্যান্ড স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হয়। বটতলা মোড়ে এসব নিয়ে কথা হয় আবদুল আলী নামে এক অটোরিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পৌর কর্তৃপক্ষ স্ট্যান্ডের জন্য জায়গা করে না দিলে আমরা কোথায় যাব। আমাদেরও তো পেট আছে। আর গাড়ি না চালালে খাব কী?’ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পুলিশ যানজট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনলে সঙ্গে সঙ্গে ওই ফাঁকা রাস্তা চলে যায় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দখলে। ছোট ছোট ঠেলাগাড়ির মধ্যে পসরা সাজিয়ে রাস্তার দুই পাশ দখল করে তারা ব্যবসা করছে। ফলে যে রাস্তা দিয়ে চার সারি যানবাহন চলার কথা, সেখানে চলতে পারে মাত্র দুই সারি গাড়ি। শহরের স্টেশন রোড, গৌরাঙ্গ বাজার ও বড়বাজারের রাস্তাগুলোতে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এদিকে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে উন্নয়নকাজ চলায় তা যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে মেয়র বলেন, ‘শহরের মূল সড়কগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। এখন অলিগলির কাজ চলছে। এগুলো হয়ে গেলে সব রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলতে পারবে। তখন যানজট অনেকটাই কমে আসবে। ’ কিশোরগঞ্জ সম্মিলিত নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক এনায়েত করিম অমি বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসন আন্তরিক হলে শহর যানজটমুক্ত হবে। কোনো শক্তিই এ উদ্যোগে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। সমস্যা হলো ক্ষুদ্র স্বার্থের কারণে আমরা কেউ এ জায়গাটিতে আসতে পারি না। অথচ সবাই মুখে বলে, আমরা যানজটমুক্ত শহর চাই। ’ ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ অভিযোগের আঙুল তুলেছে। তাদের বক্তব্য, রাত ৮টার আগে শহরে ট্রাক-বাস প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কেউ তা মানে না। পুলিশের মদদে ওই সব বড় গাড়ি দিনের বেলায় শহরের ভেতরে বিনা বাধায় ঢুকে পড়ছে। এসব যানবাহন থামিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। এসব কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে শহরে। কিশোরগঞ্জের ট্রাফিক পরিদর্শক খালেদ মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে একটি সড়ককে ওয়ানওয়ে করার সুফল আমরা পেয়েছি। শহরের গৌরাঙ্গ বাজার, বটতলা মোড়, জাহাঙ্গীরের মোড়সহ আরো বেশ কিছু রাস্তায় একমুখী চলাচলের সিদ্ধান্ত দ্রুতই বাস্তবায়ন করা হবে। তবে এসব করতে গিয়ে যে ডিভাইডার দরকার সেগুলো আমাদের হাতে নেই। পৌরসভার কিছু স্টিলের ডিভাইডার দেওয়ার কথা। সেগুলো এখনো হাতে আসেনি। কিছু কম্পানি ডিভাইডার দেওয়ার কথা বলেছে। সেগুলো পেলে আরো বেশ কিছু রাস্তা ওয়ানওয়ে করা হবে। তখন যানজটও সহনীয় মাত্রায় আসবে। ’ অবৈধ স্ট্যান্ডগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, শহরের বত্রিশ ও গাইটাল বাসস্ট্যান্ড ছাড়া আর যত স্ট্যান্ড রয়েছে সবই অবৈধ। পৌর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে সহজেই অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো সরানো সম্ভব হবে। তিনি জানান, যানজট নিরসনে শহরের সব কটি ইজি বাইককে তিনি দুটি পৃথক রং করার উদ্যোগের কথা ভাবছেন। একেক দিন একেক রঙের ইজি বাইক শহরে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু

কিশোরগঞ্জ শহরের পুরান থানা এলাকায় গত বুধবার সকাল ১০টার চিত্র। নতুন স্থাপন করা সড়ক বিভাজকের দুই পাশ দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করছে যানবাহন।

মাঝেমধ্যে কিছুটা জট লেগে গেলেও পুলিশের তৎপরতায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। যানজটে অতিষ্ঠ শহরবাসীর কাছে এ এক অচেনা দৃশ্য।

এক মাস আগেও এই পুরান থানা এলাকার সড়কে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভয়াবহ যানজট লেগে থাকত। পথচারীদের হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থাটুকুও ছিল না। বিশেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজি বাইকের নৈরাজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণের পর পুরোপুরি পাল্টে গেছে এ সড়কের চেহারা। তবে শহরের অন্যান্য সড়কে যানজট পরিস্থিতির কোনোই উন্নতি হয়নি। সড়কগুলোতে ইজি বাইকের দৌরাত্ম্য জনজীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, পুরান থানা এলাকার যানজটমুক্ত সড়কের এ চিত্র পুলিশ না থাকলেই পাল্টে যায়।

পুলিশের চেষ্টায় সকালের দিকে যানজট নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিকেল থেকে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্ধ্যার দিকে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। যানজট একরামপুর হয়ে গৌরাঙ্গ বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তাবন্দি থাকতে হয় লোকজনকে।

শোলাকিয়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের কঠোরতার ওপর শহরের যানজটের মাত্রা ওঠানামা করে। এ যেন জোয়ার-ভাটা। ইজি বাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যানজট থেকে মুক্তি মিলবে না শহরবাসীর। ইজি বাইকে তো আনইজি হয়ে পড়েছে জীবন। ’

পুরান থানা এলাকা পার হয়ে গৌরাঙ্গ বাজার মোড়ে যেতেই দেখা গেল যানজটের সেই চিরচেনা দৃশ্য। সেখানে কথা হয় মোশারফ হোসেন নামে এক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওপারে যাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট ধরে রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে আছি। সরু রাস্তায় কয়েকটি সারি করে গাড়িগুলো যানজটে দাঁড়িয়ে আছে। ফুটপাতগুলোও বলতে গেলে ব্যবসায়ীদের দখলে। রাস্তায় পা ফেলার মতো অবস্থাও নেই। ’

সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শহরের একরামপুর, সতাল, স্টেশন রোড, কাছারি মোড়, রথখলা সড়ক, বড়বাজার, জাহাঙ্গীরের মোড়, মোরগমহাল, কালীবাড়ি মোড়, বটতলা, জেনারেল হাসপাতাল এলাকা, আখড়াবাজার মোড়, তেরিপট্টি ঘুরে যানজটের ভীতিকর পরিস্থিতি চোখে পড়ে। এ সময় স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, অফিসগামী লোকজন, সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

কিশোরগঞ্জ শহরে যানজটের বেশ কিছু কারণ বিভিন্ন সময় চিহ্নিত করা হলেও সেসব সমাধানে বড় কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এসবের মধ্যে অপ্রশস্ত সড়ক, অবৈধ ইজি বাইক, শহরজুড়ে অবৈধ স্ট্যান্ড, সমন্বয়হীন উন্নয়নকাজ, ফুটপাত দখল, রাস্তা দখল করে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট অন্যতম।

যানজট প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ বলেন, ‘কয়েক মাস আগে ইজি বাইক নিয়ন্ত্রণসহ আরো কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলাম। এর অংশ হিসেবে ৬০০ ইজি বাইককে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছিল, যেগুলো কেবল শহরের মধ্যে চলাচল করার কথা। শহরের বাইরে অর্থাৎ বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা অটোরিকশাগুলোকে শহরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না। তখন শহরের যানজট পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু সহযোগিতার অভাবে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। ’

ঠিক কতসংখ্যক ইজি বাইক শহরে চলাচল করছে সে হিসাব দিতে পারেননি কিশোরগঞ্জ বিআরটিএর মোটরযান নিয়ন্ত্রণ পরিদর্শক সাইফুল কবির। তিনি বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে এগুলো অবৈধ যানবাহন। তাই ইজি বাইকের কোনো পরিসংখ্যান আমাদের খাতায় নেই। তবে সংখ্যাটা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজারের কম হবে না। এগুলো বন্ধ করতে হাইকোর্টের নির্দেশনাও রয়েছে। আমরা সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি। ’ তিনি জানান, আগে বিদেশ থেকে ইজি বাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি করা হলেও বর্তমানে তা বন্ধ। তবে দেশেই এখন এগুলো তৈরি হচ্ছে বলে নতুন নতুন ইজি বাইক প্রতিদিন রাস্তায় নেমে যানজট সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। ছোট্ট একটি শহরে ১০ হাজার ইজি বাইক চললে যানজট কিভাবে কমবে?

প্রধান সড়কগুলোতে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, বেসরকারি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ও হাসপাতাল শহরের যানজটে ভূমিকা রাখছে। একরামপুর থেকে কালীবাড়ি মোড় পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার সড়কে ১৪টি বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসবের কোনোটিতেই গাড়ি রাখার পৃথক জায়গা রাখা হয়নি। এসব রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের সামনে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। এসব কারণে শহরে যানজটের সৃষ্টি হয়।

বত্রিশ এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে এলোমেলোভাবে রাখা গাড়িগুলো শহরের যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্র ও শনিবারে রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় থাকে। তখন শহরে যানজট আরো বেড়ে যায়। ’

শহরের এমন কোনো সড়ক নেই, যেখানে অবৈধভাবে ইজি বাইকের স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়নি। এসব সড়কে রাস্তা দখল করে ইজি বাইকগুলো যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে। ফলে রাস্তার অর্ধেকটাই এসব গাড়ির দখলে চলে যায়। শহরজুড়ে এ ধরনের ২০ থেকে ২৫টি স্ট্যান্ড রয়েছে।

যানজট সৃষ্টিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাও কম যায় না। পুরান থানা, একরামপুর, উকিলপাড়া, হাসপাতাল, বটতলা মোড়, বত্রিশ, নগুয়া, ফায়ার সার্ভিস এলাকাসহ আরো বেশ কিছু এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে অটোরিকশার স্ট্যান্ড। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এসব স্ট্যান্ড স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হয়। বটতলা মোড়ে এসব নিয়ে কথা হয় আবদুল আলী নামে এক অটোরিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পৌর কর্তৃপক্ষ স্ট্যান্ডের জন্য জায়গা করে না দিলে আমরা কোথায় যাব। আমাদেরও তো পেট আছে। আর গাড়ি না চালালে খাব কী?’

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পুলিশ যানজট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনলে সঙ্গে সঙ্গে ওই ফাঁকা রাস্তা চলে যায় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দখলে। ছোট ছোট ঠেলাগাড়ির মধ্যে পসরা সাজিয়ে রাস্তার দুই পাশ দখল করে তারা ব্যবসা করছে। ফলে যে রাস্তা দিয়ে চার সারি যানবাহন চলার কথা, সেখানে চলতে পারে মাত্র দুই সারি গাড়ি। শহরের স্টেশন রোড, গৌরাঙ্গ বাজার ও বড়বাজারের রাস্তাগুলোতে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

এদিকে শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে উন্নয়নকাজ চলায় তা যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে মেয়র বলেন, ‘শহরের মূল সড়কগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। এখন অলিগলির কাজ চলছে। এগুলো হয়ে গেলে সব রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলতে পারবে। তখন যানজট অনেকটাই কমে আসবে। ’

কিশোরগঞ্জ সম্মিলিত নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক এনায়েত করিম অমি বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসন আন্তরিক হলে শহর যানজটমুক্ত হবে। কোনো শক্তিই এ উদ্যোগে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। সমস্যা হলো ক্ষুদ্র স্বার্থের কারণে আমরা কেউ এ জায়গাটিতে আসতে পারি না। অথচ সবাই মুখে বলে, আমরা যানজটমুক্ত শহর চাই। ’

ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ অভিযোগের আঙুল তুলেছে। তাদের বক্তব্য, রাত ৮টার আগে শহরে ট্রাক-বাস প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কেউ তা মানে না। পুলিশের মদদে ওই সব বড় গাড়ি দিনের বেলায় শহরের ভেতরে বিনা বাধায় ঢুকে পড়ছে। এসব যানবাহন থামিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। এসব কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে শহরে।

কিশোরগঞ্জের ট্রাফিক পরিদর্শক খালেদ মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে একটি সড়ককে ওয়ানওয়ে করার সুফল আমরা পেয়েছি। শহরের গৌরাঙ্গ বাজার, বটতলা মোড়, জাহাঙ্গীরের মোড়সহ আরো বেশ কিছু রাস্তায় একমুখী চলাচলের সিদ্ধান্ত দ্রুতই বাস্তবায়ন করা হবে। তবে এসব করতে গিয়ে যে ডিভাইডার দরকার সেগুলো আমাদের হাতে নেই। পৌরসভার কিছু স্টিলের ডিভাইডার দেওয়ার কথা। সেগুলো এখনো হাতে আসেনি। কিছু কম্পানি ডিভাইডার দেওয়ার কথা বলেছে। সেগুলো পেলে আরো বেশ কিছু রাস্তা ওয়ানওয়ে করা হবে। তখন যানজটও সহনীয় মাত্রায় আসবে। ’ অবৈধ স্ট্যান্ডগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, শহরের বত্রিশ ও গাইটাল বাসস্ট্যান্ড ছাড়া আর যত স্ট্যান্ড রয়েছে সবই অবৈধ। পৌর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে সহজেই অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো সরানো সম্ভব হবে। তিনি জানান, যানজট নিরসনে শহরের সব কটি ইজি বাইককে তিনি দুটি পৃথক রং করার উদ্যোগের কথা ভাবছেন। একেক দিন একেক রঙের ইজি বাইক শহরে প্রবেশ করতে পারবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY