সোনা চোরাচালানে ২৬ চক্র

753

সোনা চোরাচালান থামছেই না। প্রায় প্রতিদিনই পাচার হয়ে আসা সোনা ধরা পড়ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে। কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, যত সোনা ধরা পড়ছে, তার কয়েক গুণ বেশি সোনা পাচার হয়ে যাচ্ছে। তবে পাচার আগের চেয়ে কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
সোনা চোরাচালানের মামলা তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, চোরাচালানে জড়িত ২৬টি চক্রকে পুলিশ শনাক্ত করেছে। এই দলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা, সাবেক সাংসদ, মানি এক্সচেঞ্জ ও হুন্ডি ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। তাঁরা সবাই বাংলাদেশি। তবে তাঁদের সঙ্গে দুবাই ও ভারতের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জড়িত আছেন। আর চালান আসে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে। বাংলাদেশি চক্রের সদস্যরা মূলত চোরাই সোনা প্রাপকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেন। আবার কেউ কেউ বিনিয়োগও করেন।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এর আগে কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে কলকাতার বাহাদুর রোডের নাগরিক দীপক কুমার আচারিয়া, ভারতের মুম্বাইয়ের লালবাগের দিনেশ মঙ্গিলাল জেন, মুম্বাইয়ের খাদাক রোডের জিগনেস কুমার সুরেশ কুমার, নেপালের কাঠমান্ডুর গাওয়াপুরের গৌরাঙ্গ রোসান ও ভারতের জেমস প্রিন্স রয়েছেন। ধরা পড়ার পর তাঁরা জানিয়েছেন, সে দেশের বড় স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা সোনা আনতে লগ্নি করেন।

শুল্ক গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথিপত্র থেকে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে (আগস্ট ২০১২ থেকে আগস্ট ২০১৭) দুই টন চোরাই সোনা জব্দ করা হয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে সোনা পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিদেশিও রয়েছেন। এ সময় বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে আসামিদের প্রায় সবাই জামিনে বেরিয়ে গেছেন। অনেকে জামিন পাওয়ার পর পলাতক থেকে আবারও সোনা চোরাচালানে যুক্ত হয়েছেন।

২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দারা সোনা জব্দের ঘটনায় ২৩৪টি মামলা দায়ের করেছেন। এসব মামলায় ৩১৫ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ১৯৯টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আলোচিত মামলাগুলো তদন্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

সোনা চোরাচালান মামলার তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক শেখ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সোনা চোরাচালান চক্রের প্রধানদের অধিকাংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। কিন্তু গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই জামিনে বেরিয়ে আবার সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ছেন। এ কারণে সোনা চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, হুন্ডি ব্যবসায়ী সালেহ আহম্মেদ ও সোনা চোরাচালানি নজরুল ইসলামকে তিনি গ্রেপ্তার করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা জামিনে বেরিয়ে দুবাই চলে যান, সেখানে আবার সোনা চোরাচালানে যুক্ত হয়েছেন।

সর্বশেষ ২১ নভেম্বর দুপুরে আবদুল আলীম দুবাই থেকে একটি উড়োজাহাজে ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। গ্রিন চ্যানেল পার হওয়ার সময় শুল্ক গোয়েন্দারা ২৩২ গ্রাম সোনার বারসহ তাঁকে আটক করেন। এর আগে ১৮ নভেম্বর দুপুরে বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেল পার হওয়ার সময় দুবাই থেকে আসা দুই যাত্রী কামাল হোসেন ও আবদুস সালামের কাছ থেকে ৫০০ গ্রাম সোনার বার উদ্ধার করা হয়।

 সোনা কেন পাচার হয়

ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের সোনার দোকানগুলোতে যেসব সোনা দেখা যায়, তার প্রায় সবই চোরাই পথে আসা। তবে বাংলাদেশে সোনার বাজার খুব ছোট। সেই তুলনায় প্রতিবেশী ভারতে সোনার বাজার অনেক বড়। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ভারতের বার্ষিক সোনার চাহিদা প্রায় দেড় শ টন। ভারতের চাহিদার সোনার একটি বড় অংশই যায় চোরাই পথে। ভারতে প্রতি এক ভরি (১১.৬৬ গ্রাম) সোনা আমদানির শুল্ক চার হাজার রুপি (৪ হাজার ৮০০ টাকা। বাংলাদেশে শুল্ক ভরিতে তিন হাজার টাকা। এই শুল্ক কর ফাঁকি দিতেই সোনা চোরাচালান হয়।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা প্রথম আলোকে বলেন, সোনা চোরাচালানিরা নিরাপদ রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছেন।

সমিতির তথ্যমতে, দেশে ১৫ হাজার জুয়েলার্সের দোকান আছে। এতে বছরে ৭ হাজার কেজির মতো সোনার চাহিদা রয়েছে। প্রবাসীদের ব্যাগেজে আনা সোনা ও পুরোনো সোনা দিয়ে বাংলাদেশের বাজার চলে।

 কীভাবে সোনা আসে

একাধিক শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে সোনার বড় চালান নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায়। এ কাজে সহায়তা করেন শুল্ক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও বিমানের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ১০ তোলা ওজনের একেকটি সোনার বার বিমানবন্দর থেকে বাইরে এনে দিলে চোরাচালানিদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পান তাঁরা। দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিমানের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সোনা পরিবহনে সহায়তা করেন। বাহকদের হাতে সোনা ধরিয়ে দেন দুবাইয়ে অবস্থানরত চক্রের প্রধানেরা। বাহক সেই সোনা বিমানের আসনের নিচে, শৌচাগারে বা অন্য কোনো স্থানে লুকিয়ে রেখে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। পরে বিমানবন্দরে কর্মরত লোকজন নিজ দায়িত্বে সেই সোনা বের করে বাইরে নিয়ে আসেন। মানি এক্সচেঞ্জের মালিকেরা সোনা হাতবদলে মধ্যস্থতা করে কমিশন পান, আবার তাঁরা কখনো কখনো টাকা বিনিয়োগও করেন।

কারা সোনা আনেন

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, সোনা চোরাচালানের আটটি মামলা তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন সময় পুলিশের তদন্তে যাঁদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছে আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ কাজী সিরাজুল ইসলামের নাম। পুলিশ জানায়, ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শৌচাগার থেকে সাড়ে ১৩ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা আসামি দেব কুমার দাসের জবানবন্দিতে সোনা চোরাচালানে আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ কাজী সিরাজুল ইসলামের নাম উঠে আসে। কাজী সিরাজুল ইসলাম আমিন জুয়েলার্সের মালিক।

জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সোনা চোরাচালানে জড়িত নই। এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এগুলো বিদেশের লোকেরা করে।’

অন্য একটি মামলায় পুলিশের অভিযোগপত্রে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রিয়াজউদ্দিনের নাম রয়েছে।

জানতে চাইলে রিয়াজউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সোনা চোরাচালানে জড়িত নই। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।’

সোনা চোরাচালানের একাধিক মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত দ্য ঢাকা মানি এক্সচেঞ্জারের মালিক নবী নেওয়াজ খান সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নবী নেওয়াজ খানের খোঁজে তাঁর প্রতিষ্ঠান পুরানা পল্টনের সাব্বির টাওয়ারে গেলে মানি এক্সচেঞ্জারটি বন্ধ পাওয়া যায়। পাশের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জসিমউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নবী নেওয়াজ এখন আর আসেন না।

সোনা চোরাচালানে রাজধানীর ভাই ভাই মানি এক্সচেঞ্জের মিজানুর রহমান ও প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহাঙ্গীর দুটি চক্রের প্রধান বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। দিলকুশায় ভাই ভাই মানি এক্সচেঞ্জে গেলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, মিজান একসময় মুদ্রা লেনদেনে দালালি (ব্রোকারি) করতেন। পরে তাঁকে মানি এক্সচেঞ্জের পরিচালক করা হয়। তিনি আর এখন এই প্রতিষ্ঠানে নেই।

মিরপুর ১০ নম্বরের প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন সোনা চোরাচালানে জড়িত বলে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর হোসেনের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, কয়েক বছর আগে সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের দুই কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনার পর প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন বিদেশে পালিয়ে যান।

একটি চক্রের প্রধান সোনা ব্যবসায়ী দেব কুমার দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দেব কুমার দাস নিউমার্কেট-সংলগ্ন চাঁদনি চকে তাঁর রুপার দোকান রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। তবে চাঁদনি চকে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

অন্য একটি চক্রের প্রধান এস কে মোহাম্মদ আলী সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করতেন বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে। তাঁর খোঁজে পুরানা পল্টনের বহুতল আবাসিক ভবনের ‘ঠিকানা’য় গেলে নিরাপত্তাকর্মী সবুজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মোহাম্মদ আলীর পরিবার এখন আর এই বাসায় থাকে না।

সোনা চোরাচালানের দুটি চক্রের প্রধান উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক হারুন অর রশীদ সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করতেন। উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের কুশল টাওয়ারের নিচতলায় ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের নাম পরিবর্তন করে ফারহান ট্রেডার্স রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, সোনা চোরাচালানিতে গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর তিনি জামিনে বেরিয়ে এসে বিমানের টিকিট বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। অবশ্য হারুন অর রশীদ প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘আমি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নই। আমি মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসা করতাম, এ কারণে বিমানের কর্মকর্তাসহ অনেকেই বিদেশি মুদ্রা কিনতে আসতেন।’

ডিবি পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে, একটি চক্রের প্রধান মাসুদ করিম দুবাইয়ে থাকার সময় সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। পরে দেশে ফিরে তাঁর অপর দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে সোনা চোরাচালান চক্র গড়ে তোলেন। গত ২২ অক্টোবর ৪৫টি ও ২১ অক্টোবর ৬০টি সোনার বার নিয়ে এসেছেন তাঁরা। দুবাই ছাড়াও মাসকট, জেদ্দা ও কুয়ালালামপুর থেকে তিনি সোনা আনতেন।

চোরাচালান কি বন্ধ হবে না?

সোনা চোরাচালান কেন বন্ধ হচ্ছে না, জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, গত চার বছরে মণের পর মণ সোনা আটক করে বাজেয়াপ্ত করায় চোরাচালানিরা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে সোনা চোরাচালান মামলায় সাজার পরিমাণ কম। এ কারণে মামলায় কেউ ভয় পান না, চোরাচালানও বন্ধ হয় না।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এম এ হান্নান আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারতীয় সোনা ব্যবসায়ীরা সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করেন। সরকার সহনীয় মাত্রায় কর নিয়ে সোনার আমদানি নীতিমালা করলে সোনা চোরাচালান অনেকটা বন্ধ হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, সোনা চোরাচালান মামলাগুলোর দ্রুত অভিযোগপত্র দিতে হবে। এসব মামলার বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে সোনা চোরাচালান কমে আসবে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY