দেশের স্বর্ণের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় চোরাচালানের মাধ্যমে। নিয়ন্ত্রণের পুরোটাই ব্যবসায়ীদের হাতে।
চোরাচালানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি-বেসরকারি বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ জড়িত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গতকাল ধানমণ্ডির ২৭ নম্বরে অবস্থিত মাইডাস সেন্টারে টিআইবির কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ‘বাংলাদেশের স্বর্ণ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রকিবুল হাসান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বর্ণ চোরাচালানচক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ, সরকারি ও বেসরকারি বিমান সংস্থার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাংশ, যেমন—পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রু, ফ্লাইট স্টুয়ার্ট, বিমানবালা, চিফ পার্সার, জুনিয়র পার্সারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মী, চোরাচালান প্রতিরোধসংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশ এবং বিমানে খাদ্য ও পানীয় সরবরাহকারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একাংশ জড়িত। এসব স্বর্ণ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধভাবে মূলত বাংলাদেশ বিমান ও দেশীয় বেসরকারি বিমান সংস্থার মাধ্যমে দেশে ঢোকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার বছরে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা প্রায় এক হাজার ৬৭৫ কেজি স্বর্ণ আটক করা হয়েছে। তবে তা দেশে আসা স্বর্ণের চালানের খুবই সামান্য পরিমাণ। চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ কেবল দেশেই আসছে না, এসব স্বর্ণের বেশির ভাগই আবার বেনাপোল, সোনামসজিদ ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ চোরাচালানের বড় রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ছোট চালান দেশে আনার সময় (এক কেজির কম) সাধারণত প্রবাসী শ্রমিক, নিয়মিত যাত্রীকে প্রলোভন দেখিয়ে নানা কৌশলে আনা হয়। আর বড় চালানের ক্ষেত্রে বিমানের কাঠামো ব্যবহার করে বিমানবন্দরে আনা হয়। এরপর বিমানের বর্জ্য তথা বর্জ্যবাহী মোটরযান, প্রভাবশালীদের একাংশের সঙ্গে থাকা যানবাহনের মাধ্যমে বিমানবন্দর এলাকা পার করা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি-বেসরকারি বিমান সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের হাত ধরেই এসব চোরাচালান হয়ে থাকে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চোরাচালানের রুট হিসেবেও ব্যবহূত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সরকার স্বর্ণ আমদানি-রপ্তানি একটি নিয়মের মধ্যে আনতে স্বর্ণ নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে টিআইবি একটি খসড়া নীতিমালা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে। এই নীতিমালার কাজ করতে গিয়ে সংস্থাটি স্বর্ণের বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এ গবেষণা করেছে।
দেশে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে বিমানবন্দরে আগমন ও বহির্গমন পথে স্ক্যানার ও আর্চওয়ের অপ্রতুলতা; গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তি, সতর্ক প্রহরা ও তদন্ত সক্ষমতার ক্ষেত্রে ঘাটতি, লাগেজ নির্ধারিত হ্যাঙ্গারে পাঠানোর আগে পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা; কনটেইনার ও যানবাহন তল্লাশির জন্য ‘মোবাইল ভেহিক্যাল স্ক্যানার’ না থাকা; বিমানের বিশেষ কাঠামোতে বিশেষ করে কার্গোহোল তল্লাশিতে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বাধা সৃষ্টির অভিযোগ; জনবলের ঘাটতি থাকায় শুল্ক আদায় ও নজরদারি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আবার যেসব চোরাচালানের সময় বাহক আটক হয়, সেখানে মূল হোতাদের নাম বেরিয়ে এলেও কখনো তারা আইনের আওতায় আসে না। থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাহকও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে। এসব অপরাধীর শাস্তির খুব একটা নজির নেই। এ ক্ষেত্রে মামলা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি, স্বর্ণ আটককারী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বাহকের মধ্যে বিধিবহির্ভূতভাবে আর্থিক লেনদেনের মতো ঘটনাগুলো বিচারকাজে বাধা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশের বাজারে যে স্বর্ণ কেনাবেচা হয় সেখানেও অনেক সময় গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের স্বর্ণের বাজারে সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধান, পরীবিক্ষণ তথা জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের মূল্য মূলত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও মূল্য হ্রাসের ক্ষেত্রে একই অনুপাতে কমানো হয় না। নিম্নমানের স্বর্ণ উচ্চমানে কিনতে বাধ্য করা হয় গ্রাহককে। আটক স্বর্ণের মূল্য পুষিয়ে নিতে দেশীয় বাজারে স্বর্ণালংকারের দাম ওঠানামা বা হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়। দেশের প্রথম সারির জুয়েলারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শোরুমের বেশির ভাগ অলংকার বিশেষ করে চেইন, হাতে পরার গয়না ও অন্য ভারী অলংকার মূলত বিদেশ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাগেজ রুলের মাধ্যমে আসে।
টিআইবি বলছে, এসব সমস্যা উত্তরণে একটি যুগোপযোগী নীতিমালার দাবি ছিল স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের। তবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, চোরাচালান প্রতিরোধসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বৃহৎ স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের একাংশ পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে নীতিমালা না করার বিষয়ে তত্পর রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চোরালানারে ওপর নির্ভরশীল দেশের স্বর্ণের বাজারে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায়ীরা। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেই এ নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না, আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ এত দিন পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো নজির তৈরি হয়নি।
টিআইবি এ খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে যেসব বিষয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশ করেছে তার মধ্যে রয়েছে—খাতটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার মজুদ, মান যাচাই ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা, হলমার্ক চিহ্নের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি করা, ট্যাক্স কমানো, ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ, ব্যাগেজ রুলের যথাযথ প্রয়োগ। সব মিলিয়ে ৯০টি সুপারিশ করা হয়েছে।













