আবু সাঈদ খান
নোংরা রাজনীতির শিকার আসামের বাঙালি জনগোষ্ঠী। ভারতের শাসক দল বিজেপির হিন্দুত্ববাদ আর এজিপির (আসাম গণপরিষদ) উগ্র অহমীয় জাতীয়তাবাদী নীতি এক রেখায় মিলেছে। যার প্রাথমিক নিশানা বাঙালি মুসলমান। কৌশল হিসেবে এজিপিও আগের মতো ‘বাঙালি খেদা’ আওয়াজ তুলছে না। এখন অবৈধ বাংলাদেশি বিতাড়নের কথা বলা হচ্ছে। এই অভিধায় বাঙালি মুসলমানদেরই বোঝানো হচ্ছে। এটি কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, বাঙালি মুসলমানদের বিতাড়িত করতে পারলে অহমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীরা বাঙালি হিন্দুদের নিশানা করতে পিছপা হবে না। তখন রাজনীতির হিসাব মেলাতে বিজেপিও নীরব থাকবে, তা নিয়ে সংশয়ের সুযোগ নেই।
আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে আসামের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী। ৩০ জুলাই চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা প্রকাশ হবে। সেই তালিকায় বাঙালি, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের অনেকেরই বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন আশঙ্কা ভারতের চোখ-কান খোলা রাখা নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনের। নাগরিকতা নিরূপণের জন্য কর্মরত নাগরিকপুঞ্জ বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্সকে (এনআরসি) পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করেছে মানবাধিকার সংগঠন ‘ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট হেট’ (ইউএএইচ)। ১৩ জুলাই শিলচরে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, যে প্রক্রিয়ায় আসামে এনআরসি নবীকরণের কাজ চলছে, তাতে নিরপেক্ষতা নেই; আছে শুধু সাম্প্রদায়িকতা। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ- শুধু এনআরসি কর্তৃপক্ষই নয়, পক্ষপাতিত্বের ছায়া পড়েছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষের একাংশের ওপরও। এসব কারণে নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও স্রেফ বাঙালি হওয়ার কারণে তাদের কপালে বিদেশি তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছে (সূত্র :১৪ জুলাই, দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ, আসাম)। বিধিবিধান অনুযায়ী, যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে এসেছেন; তারা আসামের অধিবাসী বিবেচিত হবেন। কিন্তু বাস্তবে তা গ্রাহ্য হচ্ছে না। কয়েক প্রজন্ম এখানে বসবাস করার পরও তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হচ্ছে। এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, এক ব্যক্তি সেনাবাহিনীতে কাজ করে অবসর নিয়েছেন, তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সম্প্রতি আসাম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য কলকাতার দৈনিক আজকালে ‘আসামে বাঙালির শরশয্যা’ নামক নিবন্ধে আসাম সরকারের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার নানা তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা নিয়ে একই ধরনের ব্যাপার চলছে। লিগেসি ডাটা প্রতিষ্ঠার জন্য যারা বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুরমার নাম সংবলিত ওই ভোটার তালিকাকে আসামের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণপত্র হিসেবে দাখিল করেছেন, ইচ্ছামতো সেসব অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। ফলে বাঙালির জন্য কোনো কিছুই আর প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। সমস্তটাই প্রতারণা। তার ওপর চলেছে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নোংরা রাজনীতি।’
এটি মনে রাখা দরকার- বাংলা-আসামসহ সমগ্র উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশের অন্তর্গত। তখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া বেআইনি ছিল না। সে সময়ে বাঙালি জনগোষ্ঠী আসামের নানা স্থানে বসতি গড়েছে। বলা যায়, বাঙালিরা আসামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আবাদযোগ্য করেছে। তারা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দায় পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশের চা বাগানে কাজ করানোর জন্য উড়িষ্যা-ঝাড়খণ্ড থেকে শ্রমিকদের আনা হয়েছে, অন্যান্য রাজ্য থেকে শহর পরিচ্ছন্ন কর্মী আনা হয়েছে। তারা বাঙালি নয়, তবে বাংলাদেশের সমমর্যাদার নাগরিক। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালিরা অহমীয়া নয়, তবে আসামী বা আসামের বাসিন্দা, ভারতীয় নাগরিক। তা ছাড়া ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলা ও আসাম (বর্তমানে বিভক্ত সাত রাজ্য) নিয়ে নতুন রাজ্য হয়েছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধের পর বাঙালি অধ্যুষিত সিলেটকে আসামের অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়। এ ছাড়া ১৯৪৭ সালে আসাম ভারতে না বাংলাদেশে থাকবে, তা নিয়ে বিতর্ক হয়। গণভোটও হয়। এর ফলে সিলেট পূর্ব বাংলায় অন্তর্ভুক্ত হলেও আসামভুক্ত হয় সিলেটের করিমগঞ্জ, কাছাড় ও হাইলাকান্দি। এরও আগে ১৮২২ সালে রংপুর থেকে বিচ্ছিন্ন করে নর্থ ইস্ট রংপুর জেলা করা হয়, যা এখন আসামের চার জেলা- ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড় ও বঙ্গাইগাঁও। মেঘালয়ের গারো হিল জেলাও ছিল গোয়ালপাড়ার অংশ। এসব জেলার বাঙালিরা যে কোনো বিবেচনায় বর্তমান আসামের ভূমিসন্তান। বলা আবশ্যক, ১৮৩৭ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত বাংলা ছিল আসামের সরকারি ভাষা। পরে শিক্ষিত অহমীয়া পণ্ডিতরা, বিশেষ করে লক্ষ্মীনাথ বেজবারুয়ার হাত ধরে অহমীয়া ভাষা বিকশিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে সরকারি ভাষায় পরিণত হয়। কিন্তু আসামের বাঙালিদের বাংলা ভাষা চর্চা বরাবরই অব্যাহত ছিল এবং আছে। ১৯৬১ সালে সংগ্রামের মাধ্যমে বরাক উপত্যকায় বাংলা সরকারি ভাষার মর্যাদায় আসীন হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের ঘটনায় তৎকালীন পাকিস্তান থেকে মানুষ ভারতে এবং ভারত থেকে পাকিস্তানে এসে বসতি গড়েছে। নানা কারণে ‘৭১ সাল পর্যন্ত উভয় দেশের মানুষের দেশান্তর হওয়া প্রক্রিয়া কমবেশি অব্যাহত ছিল। একাত্তরের পরে বাঙালিরা, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের আসামে যাওয়ার কারণ দেখি না। আর সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আসামের চেয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর। নানা সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে ভারতের চেয়েও। তারপরও বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সংকীর্ণ রাজনীতিপ্রসূত। এই সংকীর্ণ রাজনীতিতাড়িত হয়ে ভারতের সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে বিজেপি এক কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের অভিযোগ করেছিল। আর এজিপিসহ কিছু সংগঠন দাবি তুলছে- আসাম কেবল অহমীয়াদের জন্য। এ দাবি কেবল বাঙালি নয়, আসামের অন্য সব ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য হুমকি, মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
২০১১ সালের লোক গণনায় ৩ কোটি ১২ লাখের মধ্যে ৯০ লাখ বাঙালি। এখন ৩ কোটি ২৯ লাখ লোক নাগরিক নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। তাদের মধ্যে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রাথমিক খসড়া তালিকায় ১ কোটি ৯০ লাখের নাম ছিল। এখন শোনা যাচ্ছে, সেখান থেকেও দেড় লাখের নাম বাদ পড়বে। ইতিমধ্যে ‘বৈধ কাগজপত্র’ না থাকার দায়ে অনেকে পাইকারি হারে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ৬টি কারাগারের ডিটেনশন ক্যাম্পে তাদের সংকুলান হচ্ছে না। তাই গোয়ালপাড়ায় অনেক জায়গাজুড়ে ডিটেনশন ক্যাম্প নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আসামের বাঙালি, যারা আসাম বিনির্মাণের অন্যতম কারিগর, এখন তাদের একাংশের ঠাঁই হয়েছে, হচ্ছে বন্দিশিবিরে; আসামের বাঙালিদের অবস্থা নাৎসি আমলের ইহুদি, ফিলিস্তিনি বা রোহিঙ্গাদের মতো।
রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আসামের বাঙালিদের অবস্থার অনেক মিল। তাদেরও নাগরিকত্ব হরণ করে প্রথমে সাদা কার্ড অর্থাৎ ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তাদের বহিরাগত তকমা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আসামের বাঙালিদের নাগরিকত্ব কার্ডের বদলে দেওয়া হয়েছে ডি কার্ড অর্থাৎ ডাউটফুল সিটিজেন্স কার্ড। প্রশ্ন এসে যায়, এরপর কী?
ভারত ও সেনাশাসিত মিয়ানমার এক নয়। ভারত মিয়ানমারের মতো আচরণ করতে পারে তা আমরা ভাবি না। ভারত নাম শুনলে আমাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসে মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ, নেহরু, আজাদ, আম্বেদকরের নাম; একাত্তরের ইন্দিরা গান্ধী, যিনি সেই দুঃসময়ে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। সেদিন ভারতের জনগণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিল আসামের অহমীয়া, বাঙালিসহ সবাই। আমরা অহমীয়াদের প্রতিও বন্ধুত্ব অনুভব করি। অহমীয়া আর বাঙালি যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। একজন আরেকজনকে কাছে টেনেছে। গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির বাতাবরণ। ভূপেন হাজারিকা আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষ মানুষের জন্য। তিনি অহমীয়া না বাঙালি সে প্রশ্ন কখনও কারও মনে উদয় হয়নি। তিনি অহমীয়া হয়েও ছিলেন অহমীয়া ও বাঙালি উভয়েরই, সমগ্র মানবজাতির।
আমরা উপমহাদের মানুষ টুপি আর টিকির দ্বন্দ্বে অনেক জ্বলেছি, রক্ত ঝরিয়েছি। এখনও হীন রাজনীতি মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল তুলছে। আজ আসামের বাঙালিদের বাংলাদেশি চিহ্নিত করে হটানোর প্রচেষ্টা সেই রাজনীতিরই ঘৃণ্য কৌশল। এমন খেলার বলি যাতে আসামের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী না হয়, তা আসাম তথা ভারতের জনগণই নিশ্চিত করবেন, সে বিশ্বাস আমরা রাখতে চাই। তবে শঙ্কিত না হয়ে পারি না। কারণ, বাংলাদেশের মাথার ওপর ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা। নতুন করে কোনো বোঝা যেন বাংলাদেশের কাঁধে ভর না করে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
সাংবাদিক ও লেখক
ask_bangla71@yahoo.com
———————————————————————
দৈনিক সমকাল পত্রিকার ‘সম্পাদকীয় ও মন্তব্য’ বিভাগে গত ২৫ জুলাই তারিখে প্রকাশিত লেখাটির লিংক: http://samakal.com/todays-print-edition/tp-editorial-comments/article/18075235/













